ঢাকা ০৫:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ ইমনের ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল Logo ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ Logo বড়ইয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে দেড় কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করলেন সমাজসেবক আতিকুর রহমান আতিক Logo অন্ধকারে নিমজ্জিত মিনি পর্যটনখ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু বিজয়নগর সড়ক, ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা Logo বিশ্বকাপ ফাইনালের হাফটাইম ১৭ মিনিট, শাকিরা-ম্যাডোনা-জাস্টিন বিবারের পারফরম্যান্স নিশ্চিত Logo ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবার গৃহবন্দী, ৩ দিন অনাহারে শিশুসহ পরিবারের ৬ সদস্য  Logo ধামরাইয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতি Logo ইরান সংকটে ট্রাম্পের সামনে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা, বলছে নিউইয়র্ক টাইমস Logo রাজাপুরের বড়ইয়ায় মেম্বার প্রার্থী আব্দুল হালিম হাওলাদারের মতবিনিময় সভা Logo অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানববন্ধন

ইরান সংকটে ট্রাম্পের সামনে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা, বলছে নিউইয়র্ক টাইমস

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৩২:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ ৪৩ বার পঠিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত কমিয়ে আনার এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এমন এক দিকে এগোচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে টেনে নিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে যুদ্ধ শুরুর সময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সংঘাত বছরের পর বছর ধরে চলেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের বাস্তবতার সাক্ষী। শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে বিভিন্ন প্রশাসন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইরানকে ঘিরেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তেহরানের নীতিতে পরিবর্তন আনা। তবে এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যগুলোর কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সামরিক উত্তেজনা নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতি টেকেনি এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারককে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেটিও খুব অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকারিতা হারায়। ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্থায়ী শান্তির পরিবর্তে আবারও সংঘাতের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজের মতে, এই সমঝোতাকে কোনো পক্ষই স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হিসেবে দেখেনি। বরং উভয়েই এটিকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার একটি সাময়িক উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া এমন পরিস্থিতি সহজেই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষণে আরও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ থেকেই মূলত ‘অনন্ত যুদ্ধ’ ধারণাটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পর সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্রোহ দমনের প্রচেষ্টা বহু বছর ধরে চললেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়নি।

যুদ্ধবিশেষজ্ঞ লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যানের মতে, বড় শক্তিগুলো প্রায়ই মনে করে সামরিক অভিযান দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়। তাঁর মতে, ট্রাম্প যেমন ইরানকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করেছেন, তেমনি ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের ভুল হিসাব করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে সুপরিকল্পিত কৌশল প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্প স্থলবাহিনী মোতায়েনের পরিবর্তে মূলত বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্লেষণে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সে সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের লক্ষ্য ছিল সীমিত—কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া। ফলে সেই অভিযান দ্রুত শেষ হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জর্জ ডব্লিউ. বুশের আমলে ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটিতে ইরানের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। একইভাবে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার অপসারণের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং বহু বছর পর আবারও তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইসরায়েলের উৎসাহে ট্রাম্প এমন এক সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন, যার প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। লেবানন, ফিলিস্তিন এবং ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডও এই সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, ট্রাম্প চাইলে বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে সংঘাত থেকে সরে আসতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি আরও সক্রিয়ভাবে এতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন, যদিও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এবং ওই অঞ্চলে ইরানের অবস্থান ভবিষ্যতে আরও সামরিক উত্তেজনার কারণ হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধের মতো নয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তারা একটি সংগঠিত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের মুখোমুখি, যার সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ভিন্ন মাত্রার।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে এই জলপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এই কৌশলগত অবস্থান সহজে ছাড়ার সম্ভাবনা নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান মালোনির মতে, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ এখন প্রায় নেই। তাঁর ভাষ্য, অতীতের মতো ভুল মূল্যায়ন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক ও ঝুঁকিমুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করা আগের তুলনায় অনেক কঠিন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নতুন বাস্তবতায় ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য। আলী ভায়েজের ভাষায়, দুই পক্ষ যখন একটি সমঝোতাও কার্যকর রাখতে পারেনি, তখন আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের পরিবর্তে এটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ রূপ নিতে পারে।

ট্যাগস :

ইরান সংকটে ট্রাম্পের সামনে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা, বলছে নিউইয়র্ক টাইমস

আপডেট সময় : ১২:৩২:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত কমিয়ে আনার এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এমন এক দিকে এগোচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে টেনে নিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে যুদ্ধ শুরুর সময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সংঘাত বছরের পর বছর ধরে চলেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের বাস্তবতার সাক্ষী। শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে বিভিন্ন প্রশাসন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইরানকে ঘিরেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তেহরানের নীতিতে পরিবর্তন আনা। তবে এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যগুলোর কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সামরিক উত্তেজনা নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতি টেকেনি এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারককে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেটিও খুব অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকারিতা হারায়। ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্থায়ী শান্তির পরিবর্তে আবারও সংঘাতের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজের মতে, এই সমঝোতাকে কোনো পক্ষই স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হিসেবে দেখেনি। বরং উভয়েই এটিকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার একটি সাময়িক উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া এমন পরিস্থিতি সহজেই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষণে আরও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ থেকেই মূলত ‘অনন্ত যুদ্ধ’ ধারণাটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পর সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্রোহ দমনের প্রচেষ্টা বহু বছর ধরে চললেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়নি।

যুদ্ধবিশেষজ্ঞ লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যানের মতে, বড় শক্তিগুলো প্রায়ই মনে করে সামরিক অভিযান দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়। তাঁর মতে, ট্রাম্প যেমন ইরানকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করেছেন, তেমনি ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের ভুল হিসাব করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে সুপরিকল্পিত কৌশল প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্প স্থলবাহিনী মোতায়েনের পরিবর্তে মূলত বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্লেষণে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সে সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের লক্ষ্য ছিল সীমিত—কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া। ফলে সেই অভিযান দ্রুত শেষ হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জর্জ ডব্লিউ. বুশের আমলে ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটিতে ইরানের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। একইভাবে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার অপসারণের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং বহু বছর পর আবারও তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইসরায়েলের উৎসাহে ট্রাম্প এমন এক সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন, যার প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। লেবানন, ফিলিস্তিন এবং ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডও এই সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, ট্রাম্প চাইলে বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে সংঘাত থেকে সরে আসতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি আরও সক্রিয়ভাবে এতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন, যদিও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এবং ওই অঞ্চলে ইরানের অবস্থান ভবিষ্যতে আরও সামরিক উত্তেজনার কারণ হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধের মতো নয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তারা একটি সংগঠিত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের মুখোমুখি, যার সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ভিন্ন মাত্রার।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে এই জলপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এই কৌশলগত অবস্থান সহজে ছাড়ার সম্ভাবনা নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান মালোনির মতে, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ এখন প্রায় নেই। তাঁর ভাষ্য, অতীতের মতো ভুল মূল্যায়ন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক ও ঝুঁকিমুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করা আগের তুলনায় অনেক কঠিন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নতুন বাস্তবতায় ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য। আলী ভায়েজের ভাষায়, দুই পক্ষ যখন একটি সমঝোতাও কার্যকর রাখতে পারেনি, তখন আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের পরিবর্তে এটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ রূপ নিতে পারে।