বাংলাদেশে আর গুম ও ‘আয়নাঘরের’ স্থান হবে না: রাষ্ট্রপতি
- আপডেট সময় : ০২:৪২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ১৯ বার পঠিত

স্বাধীন বাংলাদেশে গুম, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালার মতো ঘটনার আর কোনো স্থান হবে না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে কোনো মাকে নিখোঁজ সন্তানের অপেক্ষায় কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য অশ্রু বিসর্জন দিতে হবে না।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার মানুষদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস এমন একটি দিন, যা নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের সীমাহীন বেদনা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর অসংখ্য মা-বাবা সন্তান ফিরে আসার আশায় দিন গুনেছেন। অনেক স্ত্রী প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একাকী জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে সংগ্রাম করে চলেছেন। আবার এমন অনেক সন্তান রয়েছে, যাদের শৈশব কেটেছে বাবার ফেরার অপেক্ষায়, কিন্তু সেই বাবা আর কখনো ফিরে আসেননি।
গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবার এবং স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব মানুষের স্মৃতি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। গুমের শিকারদের আত্মার শান্তি ও মাগফিরাতও কামনা করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, গুম কোনো সাধারণ অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি গুরুতর অপরাধ। একটি মানুষকে গুম করার মাধ্যমে শুধু একজন ব্যক্তিই হারিয়ে যান না, ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, হাসি, শান্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিও।
তিনি বলেন, দেশের সংবিধান নাগরিকদের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। অথচ গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে একযোগে এসব মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়।
গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই সময়ে দেশে গুম এবং গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘরের’ মতো ভয়াবহ ঘটনার বিস্তার ঘটেছিল। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাদের অনেককেই তুলে নেওয়া, গুম করা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোপনে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সে সময় রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব গুরুতর অপরাধের ঘটনা অস্বীকার করে গেছে।
গুমের শিকার কয়েকজনের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অসংখ্য মানুষের পরিবার আজও প্রিয়জন হারানোর বেদনা বহন করছে। তাদের রাতের পর রাত কেটেছে অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার মধ্যে।
তিনি আরও বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন মত ও পেশার বহু মানুষকে দীর্ঘ সময় গোপন স্থানে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক ও গৃহবধূও এই ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, আলো-বাতাসহীন এবং অমানবিক পরিবেশে বন্দিজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল ভয়াবহ ও দুঃসহ।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মঞ্চে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করার পর দেশের বাইরে ফেলে আসা হয়েছিল। গুমের শিকারদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীতে ফিরে এলেও এখনও এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশে গুম ও নির্যাতনের মতো সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাতীয় ইতিহাসের অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক অধ্যায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসব অপরাধের বিচার দেশের মাটিতেই হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তবে এখন প্রতিশোধের পথে না গিয়ে প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এতে উঠে আসা তথ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক ও ভয়াবহ। কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুমের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ অথবা মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশনের প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে তুলে নেওয়া ও গোপনে হত্যার যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে এসব নৃশংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার অভিযোগের বিচার কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শুধু অপরাধীদের বিচার করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে। এসব পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া উচিত যেখানে রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে নাগরিকদের মধ্যে ভয় থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন করার সুযোগও থাকবে না।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা অবশ্যই সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পরিচালিত হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির মতে, একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং কল্যাণমুখী—এবং তার নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছেন, সেটিই প্রকৃত উন্নয়নের বড় সূচক।
সবশেষে রাষ্ট্রপতি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চান যে স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মা সন্তান হারিয়ে কিংবা কোনো স্ত্রী স্বামীর অপেক্ষায় আজীবন কাঁদবেন না।
তিনি বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। অপরাধী যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, দেশে যেন ভবিষ্যতে আর কখনো ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে, সে জন্য সব পথ বন্ধ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

























