সুন্দর পরিবেশ-দূষণমুক্ত বছরের প্রত্যাশা নিয়ে আতশবাজির অসুস্থ প্রতিযোগিতা!
- আপডেট সময় : ০৯:৩১:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৪ ১৫১ বার পঠিত

আয়েশা আক্তার:
আচ্ছা ধরুন মাঝরাত, গভীর ঘুমে আপনি। আচমকা খুব কাছে প্রচণ্ড শব্দে যদি বোমা ফাটে অথবা বড়সড় ভূমিকম্প হয়, আতঙ্কের মাত্রাটা কেমন হতে পারে? আতশবাজির অসুস্থ প্রতিযোাগিতায় মেতে থাকা মানুষদের তৈরি এমন বিকট শব্দে ঠিক এই ঘটনাটাই পাখিদের সঙ্গে ঘটে, যা প্রতি বছরই নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ঘণ্টাব্যাপী চলমান থাকে।
প্রতিবারই নতুন বছরকে আরম্ভরপূর্ণ আয়োজন-উদযাপনের মধ্য দিয়ে বরণ করা হয়। একদিকে রাতের আকাশে উড়তে থাকা হাজার হাজার ফানুস, অন্যদিকে তীব্র আলোর ঝলকানিতে চলে আতশবাজির অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ক্ষণিকের আলোয় আলোকিত পৃথিবী দেখতে যতটা সুন্দর, এর পেছনের প্রভাব ততটাই ভয়ংকর। এত বিকট শব্দ,তীব্র আলোর ঝলকানি এবং এর সঙ্গে যে পরিমাণ ক্ষতিকর রাসায়নিক কণা বাতাসে ছড়ায় তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই সাময়িক উদযাপন কিছু প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেয় যে বিষয়টি চিন্তাতেই আনা প্রয়োজন মনে করে না যখন তারা থার্টি ফার্স্ট নাইটকে ঘিরে সব আনন্দ-উল্লাশে মেতে থাকে।
চোখ ধাঁধানো আলোয় উদযাপন করতে গিয়ে সজ্ঞানে প্রকৃতির যে কি পরিমাণ ক্ষতি আমরা করি, তা হয়তো বোঝার চেষ্টাও করি না। রসায়নবিদ ও পাইরো টেকনিস্ট গুনটার ক্লেইন-সমারের মতে, একটি আতশবাজিতে ৭৫% পটাশিয়াম নাইট্রেট, ১৫% চারকোল এবং ১০% পর্যন্ত সালফার থাকতে পারে। এগুলোর প্রত্যেকটিই পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর। ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই কণাগুলো ধাতুর লবণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে শুধু যে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে তা নয়, এর ফলে “গ্রিনহাউস” গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত কার্বন মনোঅক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেনযুক্ত গ্যাস তৈরি হয়। যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। এই গ্যাস এবং ধাতুযুক্ত কণাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে খুব দ্রুত ফুসফুস এবং রক্তে মিশে যেতে পারে। ফলস্বরূপ তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে।
থার্টি ফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে চারদিকে আতশবাজি ও আগুনের ঝলকানিতে উন্মাদ থাকে মানুষ। বুঝে না-বুঝে উন্মাদনার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া আজকাল আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে! আতশবাজির বিকট শব্দ এবং উড়ন্ত ফানুসের কারণে অসংখ্য পাখি ছুটে বেড়ায় দিগ্বিদিক। বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে এলোপাতাড়ি উড়তে গিয়ে কখনো দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা লেগে, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আঘাত পেয়ে আবার কখনো হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয় মারা যায় পাখিরা। কী মর্মান্তিক দৃশ্য!
নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে গিয়ে মানুষ একই সঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের জন্য ভয়াবহ রকমের বিপদ ডেকে আনছে। শুধু তাই নয়, আতশবাজির শব্দ স্বাভাবিক শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, যা অল্প বয়সি শিশু ও বয়স্ক মানুষজনকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়। প্রতিবারই থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে আতশবাজি, পটকা ফুটানো বা ফানুস উড়ানো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নানা ধরনের বিধিনিষেধ দেওয়া হলেও তা কেবল নির্দেশনা এবং কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। মানুষ বিধিনিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মতো করেই উদযাপন করতে থাকে।
আচ্ছা বছরের প্রথম সূর্যোদয়টা যদি নিকষ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আর পাশে যদি পড়ে থাকতে দেখি শত শত মৃত পাখি এবং ক্ষুদ্রকায় জীব। তবে একটি সুন্দর পরিবেশ, দূষণমুক্ত বছর কীভাবে আশা করতে পারি আমরা? থার্টি ফার্স্ট নাইটকে চোখ ধাঁধানো আলোয় উদযাপন করতে গিয়ে প্রকৃতির আসল সৌন্দর্যটাকে ম্লান না করি আমরা।

























