স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন জাবির মীর মশাররফ হোসেন হল
- আপডেট সময় : ০৩:২৯:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০২৩ ১১৩৬ বার পঠিত

জাবি প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্যমন্ডিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। সবুজ ক্যাম্পাসে লাল ইটের স্থাপত্যশৈলীগুলো যেন ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে করেছে আরও সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে প্রজাপতির পাখার আদলে নির্মিত এ আবাসিক হল রয়েছে জাবিতে। প্রখ্যাত স্থপতি সৈয়দ মাজহারুল ইসলামের হাতে করা স্থাপত্যে জাহাঙ্গীরনগরের মতো সবুজের নৈসর্গে লাল ইটের এ আবাসিক ভবনের সঙ্গে মিশে আছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আবেগ-অনুভূতি। হলের দাপ্তরিক নাম মীর মশাররফ হোসেন হল হলেও শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের এ প্রিয় হল প্রজাপতি হল নামেই অধিক পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম একটি আকর্ষণ হলো দেশ সেরা এই ‘প্রজাপতি হল’। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও এই প্রজাপতি হলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকরাও আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। প্রজাপতি আকৃতির এই আবাসিক হলটি মন কাড়ে সবার। সবুজের মধ্যে লাল ইটের এই প্রজাপতি হলের আচ্ছাদনে প্রকৃতি পেয়েছে নতুন রূপ, নতুন প্রাণ। প্রজাপতি যে শুধু মানুষেরই আনন্দের খোরাক জোগায় তা নয়, বিশাল এই ধরণীর সৌন্দর্য চেতনার ধারক এবং বাহকও বটে। আর তাই যুগে যুগে মানুষ তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় প্রজাপতিকে স্থাপত্যশৈলীতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রজাপতি হল হিসেবে খ্যাত এই আবাসিক হলটি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে এবং ক্যাম্পাসের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ফিল্ড ও টিএসসি-ক্যাফেটেরিয়া থেকে সামান্য একটু এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে দেশ সেরা এই প্রজাপতি হলের।
জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সুদৃশ্য ও মনোরম আবাসিক ভবনের নাম মীর মশাররফ হোসেন হল নির্মিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে। বিশিষ্ট স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এমন অদ্ভুত ও দানব আকৃতির এই হলটির নকশা প্রণয়ন করেন। এটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম হল। চারতলা বিশিষ্ট হলটি মুক্ত হাওয়া ও মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। হলের প্রথম প্রভোস্ট হিসাবে রসায়ন বিভাগের ডঃ মেসবাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৭৩ সালের ৬ আগস্ট দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এটি ১৯৭৩ সালের ৬ আগস্ট থেকে ১৯৭৮ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২ নং হল হিসাবে পরিচিত ছিল। ১৯৭৮ সালের ১৪ এপ্রিল অনষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে “বিষাদ সিন্ধু” উপন্যাস রচয়িতা, অমর কথাশিল্পী মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে হলটির নাম করণ করা হয় “মীর মশাররফ হোসেন হল”, সংক্ষেপে (গঐ) হল নামে পরিচিত।
হলটিতে ৭১৬ জন ছাত্রের আসন রয়েছে। এর মধ্যে এক শয্যাবিশিষ্ট ২৬৪টি এবং দুই শয্যাবিশিষ্ট ২২৬টি কক্ষ। এছাড়া হল সংলগ্ন ১২ জন আবাসিক শিক্ষকের বাসভবন, হলের উত্তর পার্শ্বে দ্বি-তিল হল অফিস, হল ছাত্র সংসদ অফিস এবং হলের উত্তর-পশ্চিম পার্শ্বে প্রভোস্টের দ্বি-তল বাসভবন অবস্থিত। ১৯৭৩ সালের ১৪ ডিসেম্বরে হলের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৯৭৪ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ছাত্র বসবাস শুরু করে। বর্তমানে হল প্রশাসন পরিচালনার জন্য ১ জন প্রভোস্ট, ২ জন ওয়ার্ডেন, ৩ জন আবাসিক শিক্ষক, ৭ জন সহকারী আবাসিক শিক্ষক, ২ জন প্রশাসনিক অফিসার, ২২ জন তৃতীয় শ্রেণী এবং ৪১ জন ৪র্থ শ্রেণীরকর্মচারী ও ডাইনিং বয়সহ ২২জন অনিয়মিত ডাইনিং কর্মচারী রয়েছে। মূল ভবনটি দুটি ব্লকে বিভক্ত (ব্লক-এ এবং ব্লক-বি)। এই হলের মোট কক্ষ সংখ্যা ৪৯০ টি। আর বাকি দ্বৈত কক্ষগুলো ৪৫ ডিগ্রী কোণ তৈরি করে একক কক্ষগুলোর সাথে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থাপত্যশৈলীর কারণে নানা সুযোগ-সুবিধা পায় হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। প্রতিটি কক্ষেই সমভাবে আলো-বায়ু চলাচল করায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হয় না তাদের। হলের চার কোনায় আবাসিক শিক্ষকদের জন্য চারটি ভবন রয়েছে। যদিও বর্তমানে সেগুলোতে কেউ থাকেন না। চারতলাবিশিষ্ট হল হলেও কোনো ধরনের কংক্রিটের কলাম ছাড়াই পুরো ইটের কলামে ভবনটি টিকে আছে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে।
জাবির প্রজাপতি হলের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশালতা। প্রায় দুটি খণ্ডের এই বিশাল হলটি শুধু দেশ সেরার খেতাবই জয় করেনি বরং ইতোপূর্বে কোনো বিশাল ভবন তৈরি না হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় আবাসিক হলের খেতাবটাও এখন জাবির প্রজাপতি হলের দখলে। যা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একার গৌরবের বিষয় নয়, এই গৌরব সমগ্র দেশের, বাঙালি জাতির।
দেশের শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় অন্যতম একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। অনেকেই শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অপরূপ সৌন্দর্যের মায়ায় পড়ে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন। বাংলাদেশের একমাত্র সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার সুবাদে এখানকার সব শিক্ষার্থীই আবাসিক হলে থেকে পড়াশোনা করে থাকে। ‘মীর মশাররফ হোসেন হল’ বা প্রজাপতি হল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে ।
বিশাল আকৃতির এই প্রজাপতি হলটি ঘুরে দেখতে বেশ বেগ পেতে হয় পর্যটকদের। এদিকে বিশাল এই প্রজাপতি হল ক্যামেরা বন্দী করতে গিয়েও ব্যর্থ হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রজাপতি হলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো হলের শিক্ষার্থীরা। একমাত্র এই হলের শিক্ষার্থীরাই এই হলের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের কাছে এ যেন এক মায়ার বাঁধন। বাহারি রকমের গাছপালা, পাখপাখালি আর উঁচু উঁচু স্থাপত্যশৈলীগুলো যেন মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি এই অপরূপ সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে যেন মেতে উঠেছে এক অন্তিম কোনো লীলায়। কুয়াশা ঢাকা ভোরে ঘন জঙ্গলের ছমছমে পরিবেশ গড়ে ওঠা লাল ইটের এই বিশাল ভবনের সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। আর তাই তো ইতিহাসের সাক্ষী এ হলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমাচ্ছেন। কেউ সেলফি, কেউ বা ভিডিও ধারণ করে তাদের সেই বিশেষ মূহুর্তগুলো ক্যামেরা বন্দী করার আনন্দে মেতে উঠছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুবাসশের তালুকদার তাহসিন বলেন, সৌভাগ্যবশত আমি প্রজাপতি হলের একজন গর্বিত বাসিন্দা। হলের চারদিকের সবুজ ঘেরা পরিবেশ, রোড অব হেভেন সবসময়ই মুগ্ধ করেছে আমাকে। হলটি এত বড় যে অনেকেই হলের ভেতরে গিয়ে হারিয়ে যায়। প্রজাপতির আকৃতির এ হলটি অনন্য এক স্থাপত্য। চিরায়ত সংস্কৃতি কিংবা বিমুক্ত প্রকৃতি সবটাই যেন আপাদমস্তকে ধারণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রজাপতি হল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী রাফসান হাসান সিয়াম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল মানেই দ্বিতীয় বাসস্থান। আর সেটা যদি হয় জাবির এমএইচ হল, তাহলে অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করে। এই হলের চারপাশের সৌন্দর্য সবাইকে আকর্ষণ করে। এমন প্রজাপতি আকৃতির কোনো স্থাপনা এই দেশে আছে বলে আমার জানা নেই। যারা এই হলে থাকে না, তারাও এই হলের প্রেমে পড়তে বাধ্য। সৌন্দর্যের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ জাবির এই প্রজাপতি হল।
সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। চিঠিতে সাতদিনের মধ্যে হলটি ভেঙে ফেলার কথা বলা হয়। প্রথমদিকে চিঠির অস্পষ্টতার অভিযোগ তুললেও পরে বিষয়টি আলোচনা করে এ নিয়ে করণীয় ঠিক করতে একটি কমিটি করে সিন্ডিকেট। এ ব্যাপারে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সদস্য ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ফাউন্ডেশনের সদস্যদেরও সরেজমিনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা পরিদর্শনের শেষে ভবন ভাঙার প্রয়োজনীয়তা নেই মর্মে মতামত দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম।
উপাচার্য বাংলাদেশ কণ্ঠকে বলেন, এ হলের একজন সাবেক শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ হিসেবে আমার দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও আন্তরিকতা রয়েছে এ হলের প্রতি। সবার আবেগ-অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বাস্তবতা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এতে বুয়েটকেও যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ সদস্য ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।


















