চট্টগ্রামে বন্যায় ৯১ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি, ডুবেছে ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি
- আপডেট সময় : ০৮:২৯:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ ৪৭ বার পঠিত

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও মাছের ঘেরের বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ মাছ পানিতে ভেসে গেছে। একই সঙ্গে আউশ ধান, আমনের বীজতলা এবং মৌসুমি সবজির বিস্তীর্ণ আবাদ তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক ও মাছচাষিরা। যদিও অনেক এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তবে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও প্রকাশ পায়নি।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার পুকুর ও চিংড়ি ঘের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে জেলার ১৪ হাজার ২৯৬ দশমিক ৬৬ হেক্টর কৃষিজমি পানির নিচে চলে যায়। কর্মকর্তাদের ধারণা, পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে মাছ ও সংশ্লিষ্ট মৎস্যসম্পদের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। সেখানে ২ হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এরপরই রয়েছে সাতকানিয়া, যেখানে প্রায় ৪৬৬ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ নষ্ট হয়ে ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া লোহাগাড়ায় ৮ কোটি ৪৮ লাখ, কর্ণফুলীতে ৬ কোটি ৮ লাখ, চন্দনাইশে ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার, বোয়ালখালীতে ৪ কোটি ৫১ লাখ ৩৫ হাজার, পটিয়ায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার, ফটিকছড়িতে ২ কোটি ৭০ লাখ, হাটহাজারীতে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার, আনোয়ারায় ১ কোটি ৫০ লাখ, সন্দ্বীপে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার, মিরসরাইয়ে ৯৮ লাখ, রাঙ্গুনিয়ায় ৯৮ লাখ ৭ হাজার, রাউজানে ৯৩ লাখ এবং সীতাকুণ্ডে ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকার ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের বড় দুর্যোগগুলোর মধ্যে এবারের বন্যা অন্যতম। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে ক্ষতির মাত্রা বেশি। অনেক এলাকায় এখনও পানি পুরোপুরি নামেনি, ফলে চূড়ান্ত মূল্যায়নে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি খাতেও বন্যার প্রভাব ছিল ব্যাপক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধান, ৬২১ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ২৯৬ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমি বন্যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আউশ ধানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলায়। এর মধ্যে বাঁশখালীতে ২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চন্দনাইশে ২ হাজার ১২০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে ১ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি সাতকানিয়া, পটিয়া, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি, রাউজান, আনোয়ারা, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, মিরসরাই ও কর্ণফুলীসহ জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। চন্দনাইশে ৮৩০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ৭০০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৪৭৫ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৪৬০ হেক্টর, পটিয়ায় ৪৫৫ হেক্টর, বাঁশখালীতে ৪০০ হেক্টর এবং রাউজানে ৩১০ হেক্টর জমির সবজি আবাদ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, কর্ণফুলী, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও মিরসরাইসহ আরও কয়েকটি উপজেলায় সবজি ও আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জানান, বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। বিশেষ করে আউশ ধান ও মৌসুমি সবজির আবাদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি সম্পূর্ণ সরে গেলে মাঠপর্যায়ে পুনরায় জরিপ পরিচালনা করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং পুনরায় চাষাবাদে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সহায়তার সুপারিশ করা হবে।
























