‘কিডনি আবার গজাবে’- দালালের চক্রে নেপালের যে গ্রাম এখন ‘কিডনি ভ্যালি’
- আপডেট সময় : ০২:৩৫:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ২৬ বার পঠিত

নেপালের হোকসে গ্রামে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে বাধ্য করেছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী চক্র। ‘কিডনি আবার নতুন করে গজাবে’- দালালদের এমন অবিশ্বাস্য মিথ্যার শিকার হয়ে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই অঙ্গ হারিয়েছে। বর্তমানে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে কুখ্যাত এই জনপদে সেই অন্ধকারের দিনগুলো পেরিয়ে গেলেও, স্থানীয় মানুষের জীবনে তার দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষত এখনও দগদগে। কাঞ্চা ও রাম নামে দুই ব্যক্তি আর্থিক সংকটের কারণে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কাঞ্চা এখনো ব্যথায় ভুগছেন এবং কাজ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘কতজন এমন করেছে, তার হিসাব করা অসম্ভব। এই গ্রাম, ওই গ্রাম-সব জায়গাতেই অনেক মানুষ কিডনি বিক্রি করেছে।’
বিষয়টি অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর দালালরা হোকসে এলাকায় এসে মানুষকে কিডনি বিক্রিতে রাজি করিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা প্রতারিত ও শোষণের শিকার হয়েছেন। কারও দাবি, তাদের বলা হয়েছিল কিডনি আবার গজাবে। এসব অস্ত্রোপচারের কারণে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয়রা এই বদনাম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নেপালে দারিদ্র্য এখনো কিডনি-সংক্রান্ত নতুন সংকট তৈরি করছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে নেপালের কিডনি বিক্রির এই ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে কাজের সুযোগের আশায় থাকা নেপালিদের একটি অংশ কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যাওয়া কিছু নেপালি শ্রমিকও দেশে ফিরছেন কিডনি বিকল অবস্থায়। তীব্র গরম, পানিশূন্যতা ও কঠিন কর্মপরিবেশকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে কয়েকজন বিজ্ঞানী উল্লেখ করেছেন।
এরই মধ্যে নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইএসএলএএম (CESLAM)-সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি-এর ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নেপাল-ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে কিডনি পাচারের নতুন অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসহায় নেপালিদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হোটেলে ভালো বেতনের চাকরির কথা বলে তাদের সীমান্ত পার করানোর পর আটকে রেখে কিডনি অপসারণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
সিন্ধুলির এক ব্যক্তি ২০২৫ সালে এমন একটি চক্রের ফাঁদে পড়েন। তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পর প্রায় এক মাস একটি অ্যাপার্টমেন্টে আটকে রাখা হয়। পরে তার কিডনি অপসারণের কথা জানানো হলে তিনি রাজি হননি। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে জোর করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে অচেতন করে বাম কিডনি অপসারণ করা হয়।
ওই ব্যক্তির দাবি, কিডনি অপসারণের বিনিময়ে তাকে ৬ লাখ রুপি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেপালে ফেরত পাঠানোর সময় তাকে মাত্র ১০ হাজার রুপি দেওয়া হয়। পরে অসুস্থ হয়ে তিনি পরিবারের কাছে পুরো ঘটনা জানান এবং নেপালের অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AHTIB)-তে অভিযোগ করেন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষদের বিদেশে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অঙ্গ পাচারচক্রে ফাঁসানো হচ্ছে। ফলে একদিকে পুরোনো ‘কিডনি ভ্যালি’র ক্ষত, অন্যদিকে নতুন করে সক্রিয় কিডনি পাচারের অভিযোগ-দুই সংকটই নেপালের দারিদ্র্য ও মানুষের অসহায়তাকে সামনে নিয়ে আসছে।

















