কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে জেলারের অবহেলায় হাজতির মৃত্যু।
- আপডেট সময় : ০৩:৫৭:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬ ১৬ বার পঠিত

মোঃ আলমগীর হোসেন
জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম।
কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে হাজতির মৃত্যু, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ পরিবারের । হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু, পরিবারকে খবর দেওয়া হয় প্রায় তিন ঘণ্টা পর! সুরতহাল প্রতিবেদন ও সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে নানা প্রশ্ন।
কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে হাজতি হিসেবে থাকা ফারুক মিয়া (৪৫) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ ইং তারিখে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের চিকিৎসাসেবা, দায়িত্ব পালন এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পরিবার।
নিহত ফারুক মিয়া কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। জমিজমা-সংক্রান্ত একটি মামলায় প্রায় পাঁচ দিন আগে তিনি হাজতি হিসেবে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে যান।
পরিবারের দাবি, মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে ফারুক মিয়া মুঠোফোনে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কী কারণে তাঁর মৃত্যু হলো, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ফারুক মিয়া। এ সময় তাঁকে যথাসময়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পরে রাত আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটে কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তাঁর নিথর দেহ নিয়ে আসা হয়। তবে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুসংবাদ জানানো হয় রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটে। অর্থাৎ হাসপাতালের সময় ও পরিবারকে সংবাদ দেওয়ার সময়ের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধান রয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সাংবাদিকের প্রশ্ন
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলারকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফারুক মিয়া স্ট্রোক করে মারা গেছেন।
তখন সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, তিনি স্ট্রোক করেছিলেন—এর পক্ষে কোনো ইসিজি রিপোর্ট বা চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি রয়েছে কি না। তবে এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত জেলার সাংবাদিককে অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পরামর্শ দেন।
সুরতহাল প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন
ফারুক মিয়ার মৃত্যুর পর কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তাঁর মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজে উপস্থিত থেকে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কথা জানান।
এ সময় সাংবাদিক সুরতহাল প্রতিবেদনের কপি চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, ওই দিনই দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআইয়ের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।
পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআইয়ের কাছে প্রতিবেদন চাইলে তিনি জানান, প্রতিবেদন তৈরির আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে, পরে দেওয়া হবে।
এ নিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত ও সরবরাহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
১. ফারুক মিয়া হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে কত দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল?
২. কারাগারের অভ্যন্তরে অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
৩. স্ট্রোকের কারণে মৃত্যু হয়ে থাকলে তার চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও পরীক্ষার প্রতিবেদন কোথায়?
৪. রাত ৯টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালে নেওয়ার পর রাত ১২টা ৩০ মিনিটে পরিবারকে মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার কারণ কী?
৫. সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার পরও সাংবাদিককে তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি কেন?
৬. কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা হবে কি?
পরিবারের দাবি—নিরপেক্ষ তদন্ত চাই
একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেলে সেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ফারুক মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, কারাগারের অভ্যন্তরে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং মৃত্যুর আগে ও পরে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
পরিবারের আশঙ্কা, মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে। তবে এ আশঙ্কার সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। তাই কারাগারের সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও পরীক্ষা, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি প্রকাশ, সুরতহাল প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবারের প্রত্যাশা, ফারুক মিয়ার মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। কোনো ধরনের চিকিৎসায় অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি কিংবা অনিয়ম
প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশ্ন একটাই—কারা হেফাজতে একজন হাজতির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা কী? সত্য উদ্ঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হবে তো?















