ঢাকা ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গাজীপুরে সকালে মহাসড়কে সংঘর্ষ-বিক্ষোভ, বিকেলে স্বাভাবিক; ৩৫ কারখানায় ছুটি Logo গাজীপুরে একজনকে আটকের পর আরেক অভিযান, ২৪৪০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ২ Logo বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের DFO আমিনুলের বিরুদ্ধে ১৬ দফা অনিয়মের অভিযোগ, অপসারণসহ পাঁচ দফা দাবি Logo দেশে অনার ৬০০এসের বিক্রি শুরু, পাওয়া যাবে ড্যাজলে Logo নওগাঁয় জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগ, রাজস্ব হারানোর শঙ্কা ১০ কোটি টাকা Logo নারী ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে: বিসিবির আইনজীবী Logo মিশিগানে ইতিহাস গড়ে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল আল–সাইদ Logo মজুরি বোর্ড – ডিসেম্বরে চূড়ান্ত হবে পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো Logo ভিভো ভি৮০-এর রং, ডিজাইন ও ক্যামেরায় মুগ্ধ হবে সবাই! Logo স্ন্যাপড্রাগন ফাইভজি প্রসেসরসহ রেডমি ১৭ ফাইভজি উন্মোচন করল শাওমি

গাজীপুরে সকালে মহাসড়কে সংঘর্ষ-বিক্ষোভ, বিকেলে স্বাভাবিক; ৩৫ কারখানায় ছুটি

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৮:২৩:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ২৭ বার পঠিত

জাহিদ হাসান ভূঁইয়া, গাজীপুর প্রতিনিধি

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শিল্পাঞ্চল গাজীপুওে বুধবার সকাল থেকেই ছিল উত্তেজনা। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে থমকে যায় যান চলাচল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় দুপুরের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় পরিস্থিতি।

বুধবার সকাল থেকে মহানগরীর টঙ্গী, গাছা, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ী ও বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় বিক্ষোভে নামেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে হয়। ভোগড়া বাইপাসে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধের পর দুপুরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। দিনভর উত্তেজনার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে আন্দোলনে আহত হয়ে মারা যাওয়া শ্রমিক তৌফিকের স্মরণে গায়েবানা জানাজা আয়োজন করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা ঠেকানোর কথা বলে মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরাও।

পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার সকাল নয়টার দিকে বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন তাঁরা। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হলে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের অলিগলিতে চলে যান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁরা সড়ক থেকে সরে গেলে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে শিববাড়ির দিকে যাওয়ার পথে বাসন থানার সামনে শতাধিক শ্রমিক সড়কে জড়ো হয়ে বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় আশপাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা সড়ক বন্ধ করে দিলে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ অন্তত ১০টি সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের সরিয়ে দেয়।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানার সাইনবোর্ড এলাকায়ও দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে আটটার দিকে জয়দেবপুর এলাকাতেও শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুপুর ১২টার দিকে টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার ফ্লাইওভারের নিচে শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সেখানেও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পৌনে একটার দিকে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে তাঁদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। তবে কালিয়াকৈর উপজেলায় এদিন শ্রমিক আন্দোলনের খবর পাওয়া যায়নি।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন বলেন, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এসব ঘটনার পর ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাইন বলেন, গত সোমবার থেকে ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ছিল। মঙ্গলবার তা বাড়িয়ে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বুধবার আরও এক প্লাটুন বাড়িয়ে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আট প্লাটুন এসআরবি ও পাঁচ প্লাটুন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে রয়েছেন।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধের চেষ্টা করেছিল। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।

তৌফিকের মৃত্যু ঘিরে নতুন উত্তেজনা
শ্রমিক আন্দোলনে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া পোশাকশ্রমিক তৌফিকের মৃত্যু ঘিরেও বুধবার উত্তেজনা তৈরি হয়। তাঁর স্মরণে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে এনসিপি। বেলা পৌনে একটার দিকে চান্দনা চৌরাস্তায় জানাজার প্রস্তুতিকালে পুলিশ বাধা দেয়। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় বলে অভিযোগ করেছে দলটি।

তৌফিক (২০) গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবিবর রহমান তবির ছেলে। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্থানীয় লায়লা স্টাইলস লিমিটেড পোশাক কারখানার কাটিং সেকশনে জুনিয়র লে-ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। শ্রমিক আন্দোলনের সময় হামলায় আহত হওয়ার পর রাজধানীর উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, তৌফিকের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং তাঁর মৃত্যুর বিচার দাবিতে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়েছিল। কর্মসূচিতে কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেওয়ার পর জানাজা শুরু করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এতে এনসিপি ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আহত ব্যক্তিরা বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

আলী নাসের খান আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তৌফিকের মৃত্যুর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

রাজপথে বিএনপির নেতাকর্মীরাও
শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে শিল্পাঞ্চলে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা ঠেকানোর কথা বলে বুধবার মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরাও। সকালে টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও পথসভা করেন দলটির মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার। এসময় গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিব উদ্দিন সরকার পাপ্পু, বিএনপি নেতা সরকার শাহনুর ইসলাম রনি ও টঙ্গী থানা বিএনপির সাবেক নেতা নবীন হোসেন বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া বাসন থানা এলাকায় বিএনপি নেতা শওকত হোসেন বাবু, রফিকুল ইসলাম রাতাসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। দলটির নেতারা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিল্পকারখানার পরিবেশ শান্ত রাখা ও উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান জানান।

তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার

এদিকে, শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়ন ও ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে সাদমা গ্রুপ। গত ২ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবাদপত্রে গ্রুপ কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা একটি অরাজনৈতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্নের উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে দাবি করে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত না থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ট্যাগস :

গাজীপুরে সকালে মহাসড়কে সংঘর্ষ-বিক্ষোভ, বিকেলে স্বাভাবিক; ৩৫ কারখানায় ছুটি

আপডেট সময় : ০৮:২৩:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

জাহিদ হাসান ভূঁইয়া, গাজীপুর প্রতিনিধি

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শিল্পাঞ্চল গাজীপুওে বুধবার সকাল থেকেই ছিল উত্তেজনা। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে থমকে যায় যান চলাচল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় দুপুরের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় পরিস্থিতি।

বুধবার সকাল থেকে মহানগরীর টঙ্গী, গাছা, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ী ও বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় বিক্ষোভে নামেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে হয়। ভোগড়া বাইপাসে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধের পর দুপুরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। দিনভর উত্তেজনার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে আন্দোলনে আহত হয়ে মারা যাওয়া শ্রমিক তৌফিকের স্মরণে গায়েবানা জানাজা আয়োজন করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা ঠেকানোর কথা বলে মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরাও।

পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার সকাল নয়টার দিকে বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন তাঁরা। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হলে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের অলিগলিতে চলে যান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁরা সড়ক থেকে সরে গেলে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে শিববাড়ির দিকে যাওয়ার পথে বাসন থানার সামনে শতাধিক শ্রমিক সড়কে জড়ো হয়ে বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় আশপাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা সড়ক বন্ধ করে দিলে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ অন্তত ১০টি সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের সরিয়ে দেয়।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানার সাইনবোর্ড এলাকায়ও দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে আটটার দিকে জয়দেবপুর এলাকাতেও শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুপুর ১২টার দিকে টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার ফ্লাইওভারের নিচে শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সেখানেও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পৌনে একটার দিকে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে তাঁদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। তবে কালিয়াকৈর উপজেলায় এদিন শ্রমিক আন্দোলনের খবর পাওয়া যায়নি।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন বলেন, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এসব ঘটনার পর ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাইন বলেন, গত সোমবার থেকে ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ছিল। মঙ্গলবার তা বাড়িয়ে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বুধবার আরও এক প্লাটুন বাড়িয়ে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আট প্লাটুন এসআরবি ও পাঁচ প্লাটুন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে রয়েছেন।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধের চেষ্টা করেছিল। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।

তৌফিকের মৃত্যু ঘিরে নতুন উত্তেজনা
শ্রমিক আন্দোলনে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া পোশাকশ্রমিক তৌফিকের মৃত্যু ঘিরেও বুধবার উত্তেজনা তৈরি হয়। তাঁর স্মরণে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে এনসিপি। বেলা পৌনে একটার দিকে চান্দনা চৌরাস্তায় জানাজার প্রস্তুতিকালে পুলিশ বাধা দেয়। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় বলে অভিযোগ করেছে দলটি।

তৌফিক (২০) গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবিবর রহমান তবির ছেলে। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্থানীয় লায়লা স্টাইলস লিমিটেড পোশাক কারখানার কাটিং সেকশনে জুনিয়র লে-ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। শ্রমিক আন্দোলনের সময় হামলায় আহত হওয়ার পর রাজধানীর উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, তৌফিকের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং তাঁর মৃত্যুর বিচার দাবিতে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়েছিল। কর্মসূচিতে কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেওয়ার পর জানাজা শুরু করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এতে এনসিপি ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আহত ব্যক্তিরা বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

আলী নাসের খান আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তৌফিকের মৃত্যুর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

রাজপথে বিএনপির নেতাকর্মীরাও
শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে শিল্পাঞ্চলে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা ঠেকানোর কথা বলে বুধবার মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরাও। সকালে টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও পথসভা করেন দলটির মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার। এসময় গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিব উদ্দিন সরকার পাপ্পু, বিএনপি নেতা সরকার শাহনুর ইসলাম রনি ও টঙ্গী থানা বিএনপির সাবেক নেতা নবীন হোসেন বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া বাসন থানা এলাকায় বিএনপি নেতা শওকত হোসেন বাবু, রফিকুল ইসলাম রাতাসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। দলটির নেতারা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিল্পকারখানার পরিবেশ শান্ত রাখা ও উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান জানান।

তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার

এদিকে, শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়ন ও ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে সাদমা গ্রুপ। গত ২ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবাদপত্রে গ্রুপ কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা একটি অরাজনৈতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্নের উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে দাবি করে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত না থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।