সংকট নিরসনে ব্যাপক জ্বালানি আমদানি অব্যাহত
- আপডেট সময় : ০৪:৩৪:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ২৪ বার পঠিত

বাংলাদেশ কন্ঠ ।। বৃহস্পতিবার ।। ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ।।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বড় আকারে জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়, নিয়ন্ত্রণ ও নানা ধরনের উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে স্পষ্টভাবে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, অ্যাঙ্গোলা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অন্তত কয়েক মাসের চাহিদা পূরণে নিশ্চয়তা তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অ্যাঙ্গোলা থেকে মোট ২০টি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে ৯টি কার্গো কেনা হয় এবং ৬টি ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি কার্গোগুলোও শিগগিরই আসবে। মে মাসে আরও ১১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। নতুন উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানি কার্যক্রম চলমান। মে মাসের জন্য ১১টি কার্গো ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরকার আমদানির পাশাপাশি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও গুরুত্ব দিচ্ছে। অফিস সময় কমানো, ব্যাংকিং সময় সীমিত করা এবং বাজার ও শপিংমল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এপ্রিল মাসে কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকায় সরকার আগেই প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। কৃষকদের যাতে কোনো ধরনের জ্বালানি সংকটে না পড়তে হয়, সে জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল ও অকটেনবাহী তিনটি ট্যাংকার ভিড়েছে। এছাড়া ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এপ্রিল মাসে ২৫ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে, যার একটি অংশ ইতোমধ্যে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছেছে। বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়মিত জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিনে আনা হয়েছে, ফলে সংগ্রহ প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি এসেছে।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১,৪৪৫.০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, বছরের শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা হচ্ছে। সরকার জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি সরবরাহ বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্তত তিন মাসের মজুত সক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকেও পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সরাসরি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না।
বর্তমানে দেশে জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো সংকট নেই বলে জানান তিনি। তবে অতিরিক্ত আতঙ্ক বা অবৈধ মজুত অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে আগামী কয়েক মাস সরবরাহে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম।
সরকারের কৌশলের অংশ হিসেবে কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, আলোকসজ্জা সীমিত করা এবং সরকারি ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস চালুর মতো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে সারাদেশে ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। জ্বালানি পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযানে প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার লিটারের বেশি অবৈধভাবে মজুত করা জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে ধীরে ধীরে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে এবং সংকট অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, ২২ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে, যা সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
























