ঢাকা ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo পটুয়াখালী সবুজ বাগে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে টিনশেড ঘর ভস্মীভূত, নিঃস্ব ৪টি পরিবার! Logo ফের মা হতে চলেছেন কিয়ারা Logo বিদায়বেলায় বিশ্বকাপ ফাইনালের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে মুখ খুললেন মেসি Logo টিটিপির ড্রোন ঠেকাতে মাছ ধরার জাল ব্যবহার করছে পাকিস্তান Logo আতঙ্ক-উচ্ছ্বাস দুই নিয়েই অপেক্ষায় বাংলাদেশ Logo ইতালি পাঠানোর নামে জাল ভিসায় মালয়েশিয়া পাচার: গাজীপুর ও নরসিংদী থেকে মানব পাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার Logo সীমান্তে প্রতিদিনই অভিযান, ৬০ বিজিবির অভিযানে কোটি টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ Logo ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান আটক-৪২, মুচলেকায় মুক্তি Logo রাজাপুরে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান উপলক্ষে জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ ও সচেতন সভা অনুষ্ঠিত Logo সিনেমায় নিশো-মেহজাবীন জুটি, আসতে পারেন ঈদে

টিটিপির ড্রোন ঠেকাতে মাছ ধরার জাল ব্যবহার করছে পাকিস্তান

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৩:১২:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩০ বার পঠিত

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পুলিশ চেকপোস্টে যখন বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছিল, সে সময় পুলিশ কর্মকর্তা ফায়াজ খান ও তার সহকর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে মাথা নিচু করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছিলেন। ১৬ এপ্রিলের সেই হামলার দায় স্বীকার করেছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), যারা মূলত ‘পাকিস্তান তালেবান’ নামে পরিচিত। আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাঙ্গু জেলার ‘সারকি পিয়ালা’ পুলিশ চেকপোস্টে হামলার সময় টিটিপির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধারা চারপাশ থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেছিল। উল্লেখ্য, এই এলাকাটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রাণঘাতী হামলার অন্যতম কেন্দ্রস্থল।

৪০ বছর বয়সী পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ সেই হামলার স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া যানের চালক নিহত এবং একজন কনস্টেবল আহত হন।

আল জাজিরাকে ফায়াজ খান বলেন, “আমাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক কাজ করছিল, কারণ আমরা তখন এক যুদ্ধের মধ্যে ছিলাম। সেই মুহূর্তে আমরা জানতাম না আদৌ জীবিত বাড়ি ফিরতে পারব কি না।”

এ ধরনের হামলা প্রতিরোধের লক্ষ্যে হাঙ্গুর পুলিশ একটি অভিনব ও স্বল্প খরচের সমাধান বের করে—চেকপোস্টের ছাদ ও সীমানা প্রাচীরের মাঝখানে কয়েক মিটার উঁচুতে মাছ ধরার জাল টানিয়ে দেওয়া হয়, যা অনেকটা মাথার ওপর একটি আচ্ছাদন বা ছাদের মতো কাজ করে।

স্থানীয় পুলিশের তথ্যমতে, জেলেদের ব্যবহৃত জালের মতোই সাধারণ গঠনের এই জালটি প্রথম বসানো হয়েছিল দুই মাস আগে। ফায়াজ জানান, এরপর থেকে সারকি পিয়ালা চেকপোস্টে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি।

তিনি বলেন, “যদি কোনো ড্রোন চেকপোস্টের ওপর দিয়ে আসে, তবে সেটি জালে আটকে গিয়ে নিষ্ক্রিয় বা অকেজো হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।”

ফায়াজ যখন আলজাজিরার সঙ্গে কথা বলছিলেন, সে সময় তার সহকর্মীরা বুলেট-প্রতিরোধী ভেস্ট পরে ও হাতে বন্দুক নিয়ে কালো জালের সেই আচ্ছাদনের নিচে সতর্ক প্রহরায় ছিলেন; জালটি দড়ি ও তার দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।

“এমনকি ড্রোনটি যদি জালে আটকে না-ও পড়ে এবং জালের ওপর বিস্ফোরিত হয়, তবুও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হওয়ার কথা। কারণ, বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট অধিকাংশ স্প্লিন্টার বা ধাতব টুকরো সরাসরি মাটিতে—যেখানে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করছেন—না পড়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে” আলজাজিরাকে বলেন ফায়াজ।

হাঙ্গু জেলার পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, একটি সাধারণ চেকপোস্টকে এ ধরনের জাল দিয়ে ঢেকে ফেলতে প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি (১ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলার) খরচ হয়।

হাবিব বলেন, “ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার (চার কোণে চারটি মোটর ও প্রোপেলারযুক্ত এক ধরনের চালকবিহীন ড্রোন) হামলার প্রভাব কমাতে পুলিশ ঝুঁকিপূর্ণ থানা ও চেকপোস্টগুলোতে এই জাল ব্যবহার চালু করেছে।” তিনি আরও জানান, জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও আরও জাল বসানো হচ্ছে।

তারিক হাবিব বলেন, এ কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য হাঙ্গুর পুলিশ প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে এবং সেই অনুরোধটি বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেছেন, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত এবং ডেরা ইসমাইল খানের মতো অন্তত আরও পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলার চেকপয়েন্ট ও পুলিশ পোস্টে এই জাল বসানো হয়েছে। এমনকি প্রদেশের কিছু সামরিক ঘাঁটিতেও ড্রোন-প্রতিরোধী এই জাল ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

‘নিরাপত্তার অতিরিক্ত স্তর’

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কৌশল পরিবর্তনের জবাবেই মূলত মাছ ধরার এই জালগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে; তারা এখন বন্দুক ও মর্টারের পাশাপাশি ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলার উল্লম্ফন ঘটেছে। এসব হামলার অনেকগুলোর দায় স্বীকার করেছে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান); সংগঠনটি পাকিস্তানে তালিবান-ধাঁচের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই করছে বলে দাবি করে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বারবার কাবুলের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে টিটিপিকে নিজেদের ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আন্তঃসীমান্ত হামলা প্রতিরোধ করার দাবি জানিয়েছেন। তবে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এই হামলাগুলোকে ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।

হাঙ্গুতে এ ধরনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটেছিল ২৯ জুলাই। সেদিন হামলাকারীরা বোমা-সজ্জিত কোয়াডকপ্টার নিয়ে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ চালায় এবং এরপর স্থলপথে অতর্কিত হামলা (অ্যামবুশ) করে। এতে অন্তত ১১ জন পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সেই সংঘাতে ১৫ জন হামলাকারীও নিহত হয়; টিটিপি সেই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথ্যমতে, ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে গোলাগুলির আরেকটি ঘটনায় ছয়জন সেনা সদস্য ও আটজন হামলাকারী নিহত হন। এই হামলার ঠিক দু’দিন আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাট জেলার পুলিশের সদরপ্তরে অবিস্থত একটি মসজিদে জুমার নামাজ চলার সময় ‘ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ নামের আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বিত হামলায় ১৬ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, এ বছর হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে হাঙ্গু প্রদেশের অন্যতম সংবেদনশীল জেলায় পরিণত হয়েছে।

তবে পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান জানিয়েছেন, মাছ ধরার জালগুলো লাগানোর পর থেকে সারকি পিয়ালা এবং নিকটবর্তী বালিয়ামেনা চেকপোস্টগুলোতে কোনো ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার হামলা হয়নি।

তিনি বলেন, এই জালগুলো পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘নিরাপত্তার একটি অতিরিক্ত ও প্রয়োজনীয় স্তর’ তৈরি করেছে।

“যদি কোনো হামলা হয়ও, তবে আমাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারবে”, আলজাজিরাকে বলেন তিনি। জিশানের ধারণা, এই পদক্ষেপগুলোর ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

‘সাশ্রয়ী কিন্তু ভঙ্গুর কৌশল’

ঘন ঘন সশস্ত্র হামলার ঘটনা হাঙ্গু এলাকার পুলিশ চেকপোস্টের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে। বালিয়ামেনার ২৮ বছর বয়সী সমাজকর্মী মোহাম্মদ ওসামা জানান, এসব হামলার কারণে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হয়।

ওসামা বলেন, “সবসময়ই একটা ভয় কাজ করে যে, কোনো বিপথগামী গুলি বা অন্য কোনো কিছুর আঘাতে আমাদের সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমরা কেবল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদ দূর করেন, যাতে আমরা আমাদের এলাকায় শান্তিতে বসবাস করতে পারি, আমাদের সন্তানরা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে এবং মানুষ কোনো ভয় ছাড়াই কাজে যেতে পারে।”

ওসামা জানান, তার এলাকায় মাছ ধরার জাল লাগানোর পর থেকে তিনি অতর্কিত হামলার সংখ্যা কমে যেতে দেখেছেন।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশলটি হয়তো ‘নিরাপত্তার এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা’ তৈরি করতে পারে। ইসলামাবাদ-ভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল আলজাজিরাকে বলেন, “নির্দিষ্ট কিছু স্থানে জাল বসানো একটি অপরিপক্ব ও সস্তা কৌশল; কারণ সবসময় যে পুলিশ স্টেশনই লক্ষ্যবস্তু হবে, এমন কোনো কথা নেই।”

“ড্রোন ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আঘাত করা এবং নাটকীয় দৃশ্যপট তৈরি করা।”

“আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—ড্রোন আকাশে ওড়ার সাথে সাথেই তা প্রতিহত বা ভূপাতিত করার সক্ষমতা পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আছে কি না।”

ইমতিয়াজ গুল বলেন, “ড্রোন আতঙ্ক ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো জনসমাগমস্থলে আঘাত করতে পারলেই তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত নাটকীয় প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়।”

পেশোয়ার-ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ-দমন ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক ফিদা আদিল জানান, মাছ ধরার জালের এই ধারণাটি নতুন কিছু নয়। সামরিক বাহিনী তাদের সরঞ্জাম আড়াল করতে যে ‘ক্যামোফ্লেজ নেট’ বা ছদ্মবেশ তৈরির জাল ব্যবহার করে, সেখান থেকেই এর উৎপত্তি। তিনি আরও জানান, অতি সম্প্রতি ইউক্রেনে রুশ ড্রোন প্রতিহত করার উপায় হিসেবেও এ ধরনের জালের ব্যবহার দেখা গেছে।

আদিল সতর্ক করে বলেন, বিস্ফোরক-বহনকারী ড্রোনের বিরুদ্ধে মাছ ধরার জালের কার্যকারিতা নির্ভর করে এর নকশা ও স্থাপনের পদ্ধতির ওপর। এছাড়া, বাস্তব কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পুলিশের দেওয়া ‘৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সুরক্ষা’র হিসাব যাচাই করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, “সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমেই কেবল সুরক্ষার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব।”

ফিদা আদিলের প্রশ্নের জবাবে খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের মুখপাত্র আব্দুল সালাম খালিদ আল-জাজিরাকে জানান যে, তারা কোহাট এলাকায় এই জাল ব্যবহারের পদ্ধতির একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় একটি জালের ওপর বিস্ফোরক ফেলা হয়েছিল, কিন্তু সেটি বিস্ফোরিত হয়নি।

আলজাজিরাকে হাঙ্গু এলাকার পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ খান বলেন, তিনি জানেন যে মাথার ওপর মাছ ধরার জাল টাঙিয়ে রাখাটা কোনো অভ্রান্ত বা নিশ্চিত সমাধান নয়। তিনি ও তার সহকর্মীদের জন্য এই জাল কিছুটা হলেও মানসিক স্বস্তি জোগায়—যদিও তা দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের জীবনের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

“আমরা বলতে পারি না যে এই জাল ব্যবহারের পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আমরা যেকোনো হামলার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকি। … দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করার প্রয়োজনে যদি আমাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগও করতে হয়, তবে আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করব না; আর আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন থেকে এক পা-ও পিছু হটব না।”

সূত্র : আলজাজিরা

ট্যাগস :

টিটিপির ড্রোন ঠেকাতে মাছ ধরার জাল ব্যবহার করছে পাকিস্তান

আপডেট সময় : ০৩:১২:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পুলিশ চেকপোস্টে যখন বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছিল, সে সময় পুলিশ কর্মকর্তা ফায়াজ খান ও তার সহকর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে মাথা নিচু করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছিলেন। ১৬ এপ্রিলের সেই হামলার দায় স্বীকার করেছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), যারা মূলত ‘পাকিস্তান তালেবান’ নামে পরিচিত। আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাঙ্গু জেলার ‘সারকি পিয়ালা’ পুলিশ চেকপোস্টে হামলার সময় টিটিপির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধারা চারপাশ থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেছিল। উল্লেখ্য, এই এলাকাটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রাণঘাতী হামলার অন্যতম কেন্দ্রস্থল।

৪০ বছর বয়সী পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ সেই হামলার স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া যানের চালক নিহত এবং একজন কনস্টেবল আহত হন।

আল জাজিরাকে ফায়াজ খান বলেন, “আমাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক কাজ করছিল, কারণ আমরা তখন এক যুদ্ধের মধ্যে ছিলাম। সেই মুহূর্তে আমরা জানতাম না আদৌ জীবিত বাড়ি ফিরতে পারব কি না।”

এ ধরনের হামলা প্রতিরোধের লক্ষ্যে হাঙ্গুর পুলিশ একটি অভিনব ও স্বল্প খরচের সমাধান বের করে—চেকপোস্টের ছাদ ও সীমানা প্রাচীরের মাঝখানে কয়েক মিটার উঁচুতে মাছ ধরার জাল টানিয়ে দেওয়া হয়, যা অনেকটা মাথার ওপর একটি আচ্ছাদন বা ছাদের মতো কাজ করে।

স্থানীয় পুলিশের তথ্যমতে, জেলেদের ব্যবহৃত জালের মতোই সাধারণ গঠনের এই জালটি প্রথম বসানো হয়েছিল দুই মাস আগে। ফায়াজ জানান, এরপর থেকে সারকি পিয়ালা চেকপোস্টে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি।

তিনি বলেন, “যদি কোনো ড্রোন চেকপোস্টের ওপর দিয়ে আসে, তবে সেটি জালে আটকে গিয়ে নিষ্ক্রিয় বা অকেজো হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।”

ফায়াজ যখন আলজাজিরার সঙ্গে কথা বলছিলেন, সে সময় তার সহকর্মীরা বুলেট-প্রতিরোধী ভেস্ট পরে ও হাতে বন্দুক নিয়ে কালো জালের সেই আচ্ছাদনের নিচে সতর্ক প্রহরায় ছিলেন; জালটি দড়ি ও তার দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।

“এমনকি ড্রোনটি যদি জালে আটকে না-ও পড়ে এবং জালের ওপর বিস্ফোরিত হয়, তবুও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হওয়ার কথা। কারণ, বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট অধিকাংশ স্প্লিন্টার বা ধাতব টুকরো সরাসরি মাটিতে—যেখানে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করছেন—না পড়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে” আলজাজিরাকে বলেন ফায়াজ।

হাঙ্গু জেলার পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, একটি সাধারণ চেকপোস্টকে এ ধরনের জাল দিয়ে ঢেকে ফেলতে প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি (১ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলার) খরচ হয়।

হাবিব বলেন, “ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার (চার কোণে চারটি মোটর ও প্রোপেলারযুক্ত এক ধরনের চালকবিহীন ড্রোন) হামলার প্রভাব কমাতে পুলিশ ঝুঁকিপূর্ণ থানা ও চেকপোস্টগুলোতে এই জাল ব্যবহার চালু করেছে।” তিনি আরও জানান, জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও আরও জাল বসানো হচ্ছে।

তারিক হাবিব বলেন, এ কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য হাঙ্গুর পুলিশ প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে এবং সেই অনুরোধটি বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেছেন, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত এবং ডেরা ইসমাইল খানের মতো অন্তত আরও পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলার চেকপয়েন্ট ও পুলিশ পোস্টে এই জাল বসানো হয়েছে। এমনকি প্রদেশের কিছু সামরিক ঘাঁটিতেও ড্রোন-প্রতিরোধী এই জাল ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

‘নিরাপত্তার অতিরিক্ত স্তর’

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কৌশল পরিবর্তনের জবাবেই মূলত মাছ ধরার এই জালগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে; তারা এখন বন্দুক ও মর্টারের পাশাপাশি ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলার উল্লম্ফন ঘটেছে। এসব হামলার অনেকগুলোর দায় স্বীকার করেছে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান); সংগঠনটি পাকিস্তানে তালিবান-ধাঁচের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই করছে বলে দাবি করে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বারবার কাবুলের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে টিটিপিকে নিজেদের ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আন্তঃসীমান্ত হামলা প্রতিরোধ করার দাবি জানিয়েছেন। তবে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এই হামলাগুলোকে ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।

হাঙ্গুতে এ ধরনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটেছিল ২৯ জুলাই। সেদিন হামলাকারীরা বোমা-সজ্জিত কোয়াডকপ্টার নিয়ে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ চালায় এবং এরপর স্থলপথে অতর্কিত হামলা (অ্যামবুশ) করে। এতে অন্তত ১১ জন পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সেই সংঘাতে ১৫ জন হামলাকারীও নিহত হয়; টিটিপি সেই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথ্যমতে, ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে গোলাগুলির আরেকটি ঘটনায় ছয়জন সেনা সদস্য ও আটজন হামলাকারী নিহত হন। এই হামলার ঠিক দু’দিন আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাট জেলার পুলিশের সদরপ্তরে অবিস্থত একটি মসজিদে জুমার নামাজ চলার সময় ‘ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ নামের আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বিত হামলায় ১৬ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, এ বছর হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে হাঙ্গু প্রদেশের অন্যতম সংবেদনশীল জেলায় পরিণত হয়েছে।

তবে পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান জানিয়েছেন, মাছ ধরার জালগুলো লাগানোর পর থেকে সারকি পিয়ালা এবং নিকটবর্তী বালিয়ামেনা চেকপোস্টগুলোতে কোনো ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার হামলা হয়নি।

তিনি বলেন, এই জালগুলো পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘নিরাপত্তার একটি অতিরিক্ত ও প্রয়োজনীয় স্তর’ তৈরি করেছে।

“যদি কোনো হামলা হয়ও, তবে আমাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারবে”, আলজাজিরাকে বলেন তিনি। জিশানের ধারণা, এই পদক্ষেপগুলোর ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

‘সাশ্রয়ী কিন্তু ভঙ্গুর কৌশল’

ঘন ঘন সশস্ত্র হামলার ঘটনা হাঙ্গু এলাকার পুলিশ চেকপোস্টের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে। বালিয়ামেনার ২৮ বছর বয়সী সমাজকর্মী মোহাম্মদ ওসামা জানান, এসব হামলার কারণে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হয়।

ওসামা বলেন, “সবসময়ই একটা ভয় কাজ করে যে, কোনো বিপথগামী গুলি বা অন্য কোনো কিছুর আঘাতে আমাদের সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমরা কেবল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদ দূর করেন, যাতে আমরা আমাদের এলাকায় শান্তিতে বসবাস করতে পারি, আমাদের সন্তানরা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে এবং মানুষ কোনো ভয় ছাড়াই কাজে যেতে পারে।”

ওসামা জানান, তার এলাকায় মাছ ধরার জাল লাগানোর পর থেকে তিনি অতর্কিত হামলার সংখ্যা কমে যেতে দেখেছেন।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশলটি হয়তো ‘নিরাপত্তার এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা’ তৈরি করতে পারে। ইসলামাবাদ-ভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল আলজাজিরাকে বলেন, “নির্দিষ্ট কিছু স্থানে জাল বসানো একটি অপরিপক্ব ও সস্তা কৌশল; কারণ সবসময় যে পুলিশ স্টেশনই লক্ষ্যবস্তু হবে, এমন কোনো কথা নেই।”

“ড্রোন ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আঘাত করা এবং নাটকীয় দৃশ্যপট তৈরি করা।”

“আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—ড্রোন আকাশে ওড়ার সাথে সাথেই তা প্রতিহত বা ভূপাতিত করার সক্ষমতা পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আছে কি না।”

ইমতিয়াজ গুল বলেন, “ড্রোন আতঙ্ক ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো জনসমাগমস্থলে আঘাত করতে পারলেই তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত নাটকীয় প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়।”

পেশোয়ার-ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ-দমন ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক ফিদা আদিল জানান, মাছ ধরার জালের এই ধারণাটি নতুন কিছু নয়। সামরিক বাহিনী তাদের সরঞ্জাম আড়াল করতে যে ‘ক্যামোফ্লেজ নেট’ বা ছদ্মবেশ তৈরির জাল ব্যবহার করে, সেখান থেকেই এর উৎপত্তি। তিনি আরও জানান, অতি সম্প্রতি ইউক্রেনে রুশ ড্রোন প্রতিহত করার উপায় হিসেবেও এ ধরনের জালের ব্যবহার দেখা গেছে।

আদিল সতর্ক করে বলেন, বিস্ফোরক-বহনকারী ড্রোনের বিরুদ্ধে মাছ ধরার জালের কার্যকারিতা নির্ভর করে এর নকশা ও স্থাপনের পদ্ধতির ওপর। এছাড়া, বাস্তব কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পুলিশের দেওয়া ‘৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সুরক্ষা’র হিসাব যাচাই করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, “সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমেই কেবল সুরক্ষার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব।”

ফিদা আদিলের প্রশ্নের জবাবে খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের মুখপাত্র আব্দুল সালাম খালিদ আল-জাজিরাকে জানান যে, তারা কোহাট এলাকায় এই জাল ব্যবহারের পদ্ধতির একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় একটি জালের ওপর বিস্ফোরক ফেলা হয়েছিল, কিন্তু সেটি বিস্ফোরিত হয়নি।

আলজাজিরাকে হাঙ্গু এলাকার পুলিশ পরিদর্শক ফায়াজ খান বলেন, তিনি জানেন যে মাথার ওপর মাছ ধরার জাল টাঙিয়ে রাখাটা কোনো অভ্রান্ত বা নিশ্চিত সমাধান নয়। তিনি ও তার সহকর্মীদের জন্য এই জাল কিছুটা হলেও মানসিক স্বস্তি জোগায়—যদিও তা দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের জীবনের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

“আমরা বলতে পারি না যে এই জাল ব্যবহারের পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আমরা যেকোনো হামলার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকি। … দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করার প্রয়োজনে যদি আমাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগও করতে হয়, তবে আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করব না; আর আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন থেকে এক পা-ও পিছু হটব না।”

সূত্র : আলজাজিরা