যুব উন্নয়নের ডিডি’র বিরুদ্ধে দুদকে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৪:৫৯:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ৫০ বার পঠিত

বাংলাদেশ কন্ঠ ।। রোববার ।। ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ।।
সারোয়ার জাহান জুয়েল ময়মনসিংহঃ
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থ আত্মসাত, ভুয়া বিল-ভাউচার দাখিল, ‘ভূতুড়ে প্রশিক্ষণ’ দেখিয়ে ভাতা উত্তোলন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকারও বেশি লোপাটের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। ভোলা জেলার বর্তমান উপপরিচালক ও ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ এবং শেরপুরের সাবেক উপপরিচালক মোঃ রোকন উদ্দিন ভূঁঞার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ডরমেটরি ব্যবহার করেও ভাড়া-বিল পরিশোধ না করা, জ্বালানি ও যানবাহন খাতে কাগজে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, প্রশিক্ষণ খাতে অনিয়ম এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত কিছু অভিযোগ ইতোমধ্যে তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয়ভাবে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যান্য খাতে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এখনো অমীমাংসিত থাকায় বিষয়টি নতুন করে দুদকের নজরে আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছেন।অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলায় ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি ডরমেটরির দুটি ইউনিট পরিবারসহ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলেও কোনো ভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ করেননি। এতে প্রায় ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে সহকারী পরিচালক ফকর উদ্দিনের কাছ থেকে জোরপূর্বক জমি নিজের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া সরকারি ড্রাইভার না থাকা সত্ত্বেও গাড়ির জ্বালানি বাবদ প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং গাড়ি ব্যবহার না করেও মেরামত ও যন্ত্রাংশ খাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। পোশাক তৈরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক কাজের জন্য কাপড় ক্রয় বাবদ ছয় বছরে ৫ লক্ষাধিক টাকা উত্তোলন করা হলেও ওই অর্থ দিয়ে তৈরি পোশাক বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বিভিন্ন পোশাক তৈরির উপকরণ, সেলাই মেশিন, কম্পিউটার ও আসবাবপত্র ক্রয়ের নামে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো সামগ্রী ক্রয় করা হয়নি। একই সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ উপকরণ ও প্রশিক্ষণ ভাতা বাবদ প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং ক্লাস পরিচালনা না করেও সম্মানী ভাতা বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি ১৩টি উপজেলায় অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের নামে ক্লাসে উপস্থিত না হয়েও প্রতি উপজেলা থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে ৬ বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নিজ জেলায় উপ-পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনের বিধান না থাকলেও সেই নিয়ম উপেক্ষা করে শেরপুর থেকে নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে দীর্ঘ ছয় বছর কর্মরত ছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রোকন উদ্দিন এমন অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতি রয়েছে, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী ও কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার বাসিন্দা মুজিবুল হক চুন্নু এবং কটিয়াদি আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব নূর মোহাম্মদের প্রভাব খাটিয়ে রোকন উদ্দিন নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিজ জেলায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। আরও জানা যায় তার দাপটে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন সিনিয়র উপ-পরিচালক একেএম মাহমুদুর রহমানকে কিশোরগঞ্জ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শেরপুরে বদলি করা হয় এবং রোকন উদ্দিন তখন একজন জুনিয়র সহকারী পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও কিশোরগঞ্জে চলতি দায়িত্বে উপ-পরিচালকের (ডিডি) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ক্ষমতার দাপটে ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় (উপ-পরিচালক একেএম মাহমুদুর রহমানকে) তাকে কক্ষ থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রে আরোও জানা যায়, বদলির পর শেরপুরে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই একেএম মাহমুদুর রহমান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ময়মনসিংহ জেলায় ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গুরুদন্ড শাস্তি প্রদান করা হয়। এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলায় ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে তৎকালীন সচিব মোঃ রেজাউল মাকছুদ জাহেদী ও উপসচিব মুহাম্মদ রায়হানুল হারুন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাকে নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সচিব মোঃ মাহবুব উল আলমের স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তার আত্মসাৎকৃত অর্থের একটি অংশ বেতন থেকে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা কেটে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি আত্মসাৎকৃত অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত আনুতোষিক থেকে কর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এদিকে, ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই এসব দণ্ডের বিরুদ্ধে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বরাবর ন্যায়বিচারের স্বার্থে দায়ের করা তার আপিল আবেদনও নামঞ্জুর করেছে কর্তৃপক্ষ। ময়মনসিংহে থাকাকালীন ইমপ্যাক্ট (ফেজ-৩) প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করে প্রকল্পে ব্যয় না করারও অভিযোগ রয়েছে। তার এসব কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর জেলায় বদলি করা হয়। তবে তিনি ওই আদেশ অমান্য করে জামালপুরে যোগদান না করে তৎকালীন সচিবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। পরে একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাহিরে ভোলা জেলায় বদলি করা হয়। তিনি শেরপুর জেলায় দায়িত্ব পালনকালে হল ভাড়া ও আবাসন সংক্রান্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাত করেন। একই সঙ্গে সরকারি বাসভবনে বিনামূল্যে অবস্থান করে ভাড়া বাবদ অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। বিশেষ করে ভোলা জেলায় কর্মরত থাকলেও তিনি অধিকাংশ সময় ময়মনসিংহে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রমাণ স্বরূপ এ প্রতিবেদক অভিযোগগুলোর বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভোলা জেলার উপ-পরিচালক মোঃ রোকন উদ্দিন ভূঁঞা এ প্রতিবেদককে বলেন, অভিযোগ যদি সত্য হয় তবে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে বলে ফোন কেটে দেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই আবারও এ প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, আমি ময়মনসিংহে আছি, আপনার সাথে আগামীকাল একসাথে বসে চা খেতে চাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিযোগকারী জানিয়েছেন, বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে অবিলম্বে চাকরিচ্যুত করে সরকারি আত্মসাতকৃত পুরো টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়াসহ ফৌজদারি আইনে শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দুদকের চেয়ারম্যান, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

















