ঢাকা ০৬:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজে ইরানের ঢিলেঢালা নিয়ন্ত্রণ, তবু কেন বাড়ছে তেলের দাম?

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৫:৪১:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ২১ বার পঠিত

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল রপ্তানি আবার বাড়ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ হয়ে গেছে। বরং তেলশিল্প ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৬ সেপ্টেম্বর ইরানের দেওয়া একটি শান্তিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি সাতদিনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্পের মতে, ইরান বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষা করাই বেশি লাভজনক হতে পারে বলে তার প্রশাসনের অনেকে মনে করছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির পরিমাণও যেন সেই ধারণার পক্ষেই কথা বলছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করেছে। এই হিসাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে যাওয়া তেলও ধরা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারির পর এটি সর্বোচ্চ রপ্তানি। যুদ্ধ শুরুর আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল। অন্যদিকে ইরান বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র প্রায় দুই লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। সংঘাত শুরুর আগে দেশটি যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করত, এটি তার এক-দশমাংশেরও কম। তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের ওপর
তবে তেলের বাজারের অন্য একটি চিত্র রয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান সূচক ব্রেন্টের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক সমঝোতা হওয়ার সময়ের তুলনায় দাম এখন ৪৩ শতাংশ বেশি। অথচ তখন তেল রপ্তানির পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ কম ছিল। তাহলে দাম এত বেশি কেন?
এর পেছনে তিনটি বড় কারণ উঠে এসেছে।

প্রথমত, তেলের সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় কম।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি সীমিত করতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারকে প্রভাবিত করছে।

তৃতীয়ত, ইরান আবার জাহাজ বা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাড়ছে।

সৌদি আরবের বিশেষ ব্যবস্থা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ বাড়ার অন্যতম কারণ সৌদি আরবের নতুন ব্যবস্থা।

সৌদি আরব এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তেল এই পথ দিয়ে পাঠাচ্ছে। সৌদি আরামকো গত ২৮ সেপ্টেম্বর চীনের শোধনাগারগুলোকে আগামী মাসে তেল নেওয়ার জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে দুই দফায় নয় কোটি ব্যারেলের বেশি তেল বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সৌদি আরবের বেশিরভাগ তেল এখন মার্কিন নিরাপত্তায় হরমুজ প্রণালি পার হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজগুলো প্রথমে তেল নিয়ে প্রণালি পার হচ্ছে। পরে ওমান উপসাগরে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।

ব্যবস্থা কার্যকর হলেও ব্যয়বহুল
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজগুলো বেসরকারি জাহাজের তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিতে পারছে। তাই ইরানের হুমকি বাড়লেও তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তবে সৌদি কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের এই ব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও জটিল। দীর্ঘমেয়াদে এটি চালিয়ে যাওয়াও কঠিন।

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কম তেল সরবরাহ হচ্ছে।

চীনে আবার বাড়ছে তেলের চাহিদা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ চীন।

গ্রীষ্মে চীন অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল। এখন দেশটিতে আবার তেলের চাহিদা বাড়ছে।

চীনের জেট ফুয়েল, ডিজেল ও পেট্রলের মজুত দ্রুত কমে গেছে। ফলে দেশটির পাইকারি জ্বালানির দাম এখন সরকারি নিয়ন্ত্রিত খুচরা দামের চেয়েও বেশি।

দেশীয় চাহিদা মেটাতে চীনের শোধনাগারগুলো বেশি তেল পরিশোধন করছে। একই সঙ্গে, বিদেশে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ থাকায় কিছু জ্বালানি তারা রপ্তানিও করছে।

তবে চীন অতীতে জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল। ভবিষ্যতে আবার এমন বিধিনিষেধ আসতে পারে—এই আশঙ্কায় চীনের শোধনাগারগুলো এখনই বেশি অপরিশোধিত তেল কিনছে।

ইরানের জায়গা নিচ্ছে অন্যরা
ইরান থেকে আগে যে তেল চীন কিনত, তার একটি অংশ এখন অন্য দেশ থেকে কিনতে হচ্ছে। এ কারণে চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও বেশি তেল কিনছে। ফলে তেলের দামও বাড়ছে। ইরানের তেলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে এমন তেলের দাম আরও বেশি বেড়েছে। দুবাইয়ের তেলের ফিউচার এখন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।

ইউরোপীয় ক্রেতারাও উত্তর সাগর অঞ্চলের তেলের জন্য চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এতে ব্রেন্টের দামও বাড়ছে।

ডিজেলের সংকটও তেলের দাম বাড়াচ্ছে
তেলের বাজারে চাপের আরেকটি কারণ ডিজেল। উপসাগর থেকে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং রাশিয়ার ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন বড় বাজারে ডিজেলের পাইকারি দাম প্রায় ২০০ ডলারে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৬ ডলার ৫০ সেন্টে পৌঁছেছে। এটি দেশটির জন্য রেকর্ড দাম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ইউরোপে যাচ্ছে। রপ্তানি কমানো হলে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমতে পারে।

কিন্তু ইউরোপীয় শোধনাগারগুলো তখন আরও বেশি তেল কিনে ডিজেল উৎপাদনের চেষ্টা করবে। এই সম্ভাবনাও তেলের বাজারে দাম বাড়াচ্ছে।

হরমুজে হামলার আশঙ্কা
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখনো ইরান। হরমুজ প্রণালির তেল পরিবহন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট হতে পারে।

২৩ সেপ্টেম্বরের পর এখন পর্যন্ত ইরান কোনো তেলবাহী জাহাজ অচল করেনি। তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

কিছু অসমর্থিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে মাইন বসিয়েছে বা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর ওমানের উপকূলে ৭৫টি দ্রুতগতির নৌযানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এসব নৌযান ভাসমান বিস্ফোরক বা মাইন ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইরানের হাতে উপসাগরীয় তেলক্ষেত্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানোর সক্ষমতাও রয়েছে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে হামলার পর পাইপলাইনটির কিছু অংশ মেরামত করা হলেও তা পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ঝুঁকিও কাটেনি। এ ছাড়া ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে।

তেল বেরোচ্ছে মানেই ঝুঁকি কমেনি
উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু এর অর্থ হরমুজ প্রণালি এখন নিরাপদ—এমনটা নয়। বরং তেলশিল্প দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির মধ্যেও কীভাবে সরবরাহ চালু রাখা যায়, তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।

এই ঝুঁকি যেকোনো সময় আবার বড় আকার ধারণ করতে পারে। তখন উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ আবার কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে ইরান যদি নিজেকে কোণঠাসা মনে করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

ট্যাগস :

হরমুজে ইরানের ঢিলেঢালা নিয়ন্ত্রণ, তবু কেন বাড়ছে তেলের দাম?

আপডেট সময় : ০৫:৪১:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল রপ্তানি আবার বাড়ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ হয়ে গেছে। বরং তেলশিল্প ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৬ সেপ্টেম্বর ইরানের দেওয়া একটি শান্তিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি সাতদিনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্পের মতে, ইরান বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষা করাই বেশি লাভজনক হতে পারে বলে তার প্রশাসনের অনেকে মনে করছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির পরিমাণও যেন সেই ধারণার পক্ষেই কথা বলছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করেছে। এই হিসাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে যাওয়া তেলও ধরা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারির পর এটি সর্বোচ্চ রপ্তানি। যুদ্ধ শুরুর আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল। অন্যদিকে ইরান বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র প্রায় দুই লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। সংঘাত শুরুর আগে দেশটি যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করত, এটি তার এক-দশমাংশেরও কম। তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের ওপর
তবে তেলের বাজারের অন্য একটি চিত্র রয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান সূচক ব্রেন্টের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক সমঝোতা হওয়ার সময়ের তুলনায় দাম এখন ৪৩ শতাংশ বেশি। অথচ তখন তেল রপ্তানির পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ কম ছিল। তাহলে দাম এত বেশি কেন?
এর পেছনে তিনটি বড় কারণ উঠে এসেছে।

প্রথমত, তেলের সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় কম।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি সীমিত করতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারকে প্রভাবিত করছে।

তৃতীয়ত, ইরান আবার জাহাজ বা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাড়ছে।

সৌদি আরবের বিশেষ ব্যবস্থা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ বাড়ার অন্যতম কারণ সৌদি আরবের নতুন ব্যবস্থা।

সৌদি আরব এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তেল এই পথ দিয়ে পাঠাচ্ছে। সৌদি আরামকো গত ২৮ সেপ্টেম্বর চীনের শোধনাগারগুলোকে আগামী মাসে তেল নেওয়ার জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে দুই দফায় নয় কোটি ব্যারেলের বেশি তেল বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সৌদি আরবের বেশিরভাগ তেল এখন মার্কিন নিরাপত্তায় হরমুজ প্রণালি পার হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজগুলো প্রথমে তেল নিয়ে প্রণালি পার হচ্ছে। পরে ওমান উপসাগরে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।

ব্যবস্থা কার্যকর হলেও ব্যয়বহুল
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজগুলো বেসরকারি জাহাজের তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিতে পারছে। তাই ইরানের হুমকি বাড়লেও তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তবে সৌদি কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের এই ব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও জটিল। দীর্ঘমেয়াদে এটি চালিয়ে যাওয়াও কঠিন।

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কম তেল সরবরাহ হচ্ছে।

চীনে আবার বাড়ছে তেলের চাহিদা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ চীন।

গ্রীষ্মে চীন অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল। এখন দেশটিতে আবার তেলের চাহিদা বাড়ছে।

চীনের জেট ফুয়েল, ডিজেল ও পেট্রলের মজুত দ্রুত কমে গেছে। ফলে দেশটির পাইকারি জ্বালানির দাম এখন সরকারি নিয়ন্ত্রিত খুচরা দামের চেয়েও বেশি।

দেশীয় চাহিদা মেটাতে চীনের শোধনাগারগুলো বেশি তেল পরিশোধন করছে। একই সঙ্গে, বিদেশে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ থাকায় কিছু জ্বালানি তারা রপ্তানিও করছে।

তবে চীন অতীতে জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল। ভবিষ্যতে আবার এমন বিধিনিষেধ আসতে পারে—এই আশঙ্কায় চীনের শোধনাগারগুলো এখনই বেশি অপরিশোধিত তেল কিনছে।

ইরানের জায়গা নিচ্ছে অন্যরা
ইরান থেকে আগে যে তেল চীন কিনত, তার একটি অংশ এখন অন্য দেশ থেকে কিনতে হচ্ছে। এ কারণে চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও বেশি তেল কিনছে। ফলে তেলের দামও বাড়ছে। ইরানের তেলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে এমন তেলের দাম আরও বেশি বেড়েছে। দুবাইয়ের তেলের ফিউচার এখন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।

ইউরোপীয় ক্রেতারাও উত্তর সাগর অঞ্চলের তেলের জন্য চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এতে ব্রেন্টের দামও বাড়ছে।

ডিজেলের সংকটও তেলের দাম বাড়াচ্ছে
তেলের বাজারে চাপের আরেকটি কারণ ডিজেল। উপসাগর থেকে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং রাশিয়ার ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন বড় বাজারে ডিজেলের পাইকারি দাম প্রায় ২০০ ডলারে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৬ ডলার ৫০ সেন্টে পৌঁছেছে। এটি দেশটির জন্য রেকর্ড দাম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ইউরোপে যাচ্ছে। রপ্তানি কমানো হলে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমতে পারে।

কিন্তু ইউরোপীয় শোধনাগারগুলো তখন আরও বেশি তেল কিনে ডিজেল উৎপাদনের চেষ্টা করবে। এই সম্ভাবনাও তেলের বাজারে দাম বাড়াচ্ছে।

হরমুজে হামলার আশঙ্কা
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখনো ইরান। হরমুজ প্রণালির তেল পরিবহন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট হতে পারে।

২৩ সেপ্টেম্বরের পর এখন পর্যন্ত ইরান কোনো তেলবাহী জাহাজ অচল করেনি। তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

কিছু অসমর্থিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে মাইন বসিয়েছে বা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর ওমানের উপকূলে ৭৫টি দ্রুতগতির নৌযানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এসব নৌযান ভাসমান বিস্ফোরক বা মাইন ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইরানের হাতে উপসাগরীয় তেলক্ষেত্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানোর সক্ষমতাও রয়েছে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে হামলার পর পাইপলাইনটির কিছু অংশ মেরামত করা হলেও তা পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ঝুঁকিও কাটেনি। এ ছাড়া ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে।

তেল বেরোচ্ছে মানেই ঝুঁকি কমেনি
উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু এর অর্থ হরমুজ প্রণালি এখন নিরাপদ—এমনটা নয়। বরং তেলশিল্প দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির মধ্যেও কীভাবে সরবরাহ চালু রাখা যায়, তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।

এই ঝুঁকি যেকোনো সময় আবার বড় আকার ধারণ করতে পারে। তখন উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ আবার কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে ইরান যদি নিজেকে কোণঠাসা মনে করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট