ঢাকা ০৯:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

সৌদিতে বাংলাদেশি যুবক নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, শোকে প্রাণ গেল ফুফুর

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৭:২৫:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ৫১ বার পঠিত

মনিরুজ্জামান মনির, স্টাফ রিপোর্টারঃ
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের (২৫) বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না তাঁর বাবা-মা। এদিকে, নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে স্বজনের মৃত্যু—সব মিলিয়ে পরিবারটিতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলকে যথাযথ আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির সরকার। তবে এ বিষয়ে পরিবারকে আগে থেকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের। গণমাধ্যমের খবর থেকেই তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন। নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় নজরুল এসএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২২ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরিবার জানায়, সৌদি আরবে যাওয়ার সাত-আট মাস পর থেকে নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে তিনি বাবাকে জানান, তিনি বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত কিছু জানাননি। এরপর প্রায় তিন বছর তিন মাস তিনি কারাগারে ছিলেন বলে দাবি পরিবারের। নজরুলের বাবা আবদুল বাছির জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। গত ১১ অক্টোবর ছেলের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। ওই সময় নজরুল জানান, তিনি সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। এর তিন দিন পর, ১৪ অক্টোবর ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পান তাঁরা। আবদুল বাছির বলেন, “ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। এখন ছেলে নেই, বোনও মারা গেছে। সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি, ঋণের বোঝাও রয়ে গেছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নজরুল কারাগারে থাকার সময় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর জানা মতে, কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে ছেলের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। নজরুলের মা রহিমা বেগমের দাবি, তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে যে নারীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তাঁর অভিযোগ, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকেও তাঁরা কোনো সহযোগিতা পাননি। ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। এদিকে, নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে বিরামপুর গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকাহত বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে তাঁদের বাড়িতে ভিড় করছেন। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ আবু সাঈদ জানান, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে। সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়া নজরুলের পরিবারের এখন একটাই প্রত্যাশা—সরকারের উদ্যোগে দ্রুত তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হোক। পাশাপাশি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁর আইনি সহায়তা ও বাংলাদেশি কনস্যুলেটের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোরও যথাযথ ব্যাখ্যা চান তাঁরা।

ট্যাগস :

সৌদিতে বাংলাদেশি যুবক নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, শোকে প্রাণ গেল ফুফুর

আপডেট সময় : ০৭:২৫:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

মনিরুজ্জামান মনির, স্টাফ রিপোর্টারঃ
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের (২৫) বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না তাঁর বাবা-মা। এদিকে, নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে স্বজনের মৃত্যু—সব মিলিয়ে পরিবারটিতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলকে যথাযথ আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির সরকার। তবে এ বিষয়ে পরিবারকে আগে থেকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের। গণমাধ্যমের খবর থেকেই তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন। নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় নজরুল এসএসসি পাস করার পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২২ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরিবার জানায়, সৌদি আরবে যাওয়ার সাত-আট মাস পর থেকে নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে তিনি বাবাকে জানান, তিনি বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত কিছু জানাননি। এরপর প্রায় তিন বছর তিন মাস তিনি কারাগারে ছিলেন বলে দাবি পরিবারের। নজরুলের বাবা আবদুল বাছির জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। গত ১১ অক্টোবর ছেলের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। ওই সময় নজরুল জানান, তিনি সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। এর তিন দিন পর, ১৪ অক্টোবর ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পান তাঁরা। আবদুল বাছির বলেন, “ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। এখন ছেলে নেই, বোনও মারা গেছে। সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি, ঋণের বোঝাও রয়ে গেছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নজরুল কারাগারে থাকার সময় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর জানা মতে, কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে ছেলের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। নজরুলের মা রহিমা বেগমের দাবি, তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে যে নারীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তাঁর অভিযোগ, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকেও তাঁরা কোনো সহযোগিতা পাননি। ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। এদিকে, নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে বিরামপুর গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকাহত বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে তাঁদের বাড়িতে ভিড় করছেন। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ আবু সাঈদ জানান, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে। সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়া নজরুলের পরিবারের এখন একটাই প্রত্যাশা—সরকারের উদ্যোগে দ্রুত তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হোক। পাশাপাশি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁর আইনি সহায়তা ও বাংলাদেশি কনস্যুলেটের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোরও যথাযথ ব্যাখ্যা চান তাঁরা।