ঢাকা ১১:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ২০২৯ সালের জুনে শেষ হবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৬ লেন নির্মাণ : সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রী৷ Logo ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস গ্যাসের নতুন কুপ খননের উদ্বোধন Logo পপুলার লাইফের খুলনা অঞ্চলের বীমা গ্রাহকের বীমা দাবীর ৩ কোটি ১৭ লক্ষ টাকার চেক হস্তান্তর Logo রাজাপুরের উত্তমপুর বাজারে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবের আশায় ব্যবসায়ীরা Logo ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অনারের রোবট ফোন Logo ইরান যুদ্ধে নিহত সেনাদের সংখ্যা গোপন করেছে যুক্তরাষ্ট্র Logo বলিউডে রাজত্ব করেছেন এক যুগ, কিন্তু ভালোবেসেছেন বাংলাকে Logo বিবর্ণ মিরাজ, হেটমায়ারের সেঞ্চুরির পরও গায়ানার বিদায় Logo দুপুরের মধ্যেই প্রকাশ হতে পারে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন, বেতন নিয়ে যা জানা গেল Logo লংমার্চের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বিএনপির, নজরও রাখছে

গাজীপুরে জমে উঠেছে নৌকার সঙ্গে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াই

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১০:০০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ ৩৩৪ বার পঠিত

গাজীপুর প্রতিনিধি :
গাজীপুরে ৫টি সংসদীয় আসনেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের লড়াই জমে উঠেছে। ফলে তীব্র হচ্ছে নৌকার সঙ্গে ট্রাক ও ঈগলের লড়াই। নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তীর। সংসদ সদস্য হিসেবে নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে বিরোধ বাড়ছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে। অনেক জায়গায় বিক্ষিপ্ত হামলা, পোস্টার ছেঁড়া, ভাঙচুর এবং প্রচারণায় বাধা দেয়া ও অফিস দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে গাজীপুর-১ ও ২ আসনের নৌকার প্রার্থী, মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রী এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই নির্বাচনে অন্তত ৪টি আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। গাজীপুর ১, ২, ৩ ও ৫ আসনের হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বত্র।

জানা গেছে, গাজীপুর-১ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮টি ওয়ার্ড নিয়ে এ আসন গঠিত। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য রেজাউল করিম রাসেল ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে রয়েছেন। সিটি করপোরেশনের ১৮টি ওয়ার্ড এ আসনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম সমর্থন দিয়েছেন রেজাউল করিম রাসেলকে। সিটি নির্বাচনের জাহাঙ্গীর কারিশমাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আশা করছেন রেজাউল। ট্রাক প্রতীকের প্রচারণায় বাধারও অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী তার দীর্ঘ ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং কালিয়াকৈরে তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বলেন, জাহাঙ্গীরকে তিনি গণনায় ধরেন না। ফলে সিটি এলাকার ভোটে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
গাজীপুর-২ আসনে নৌকার প্রার্থী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি তীব্র প্রতিদ্ব›দ্বিতার মুখে পড়েছেন নিজ দলের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন ও ঈগল প্রতীকের মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। সিটির ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর-২ আসন গঠিত। এখানেও জাহাঙ্গীর কারিশমা কাজে লাগাতে চাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন। তার পক্ষে জাহাঙ্গীর আলম ও তার সমর্থিত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী মাঠে নেমেছেন। ইতোমধ্যে ট্রাক প্রতীকের প্রার্থীর প্রচার অভিযানে একাধিকবার বাধা প্রদান, নির্বাচনী অফিস দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টঙ্গীর মাছিমপুরে ট্রাক প্রতীকের নির্বাচনী অফিসে হামলা ও টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠে প্রবেশের সময় গেটে তালা লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা ছাড়াও টঙ্গী টিএনটি গেট এলাকায় ট্রাক প্রতীকের আঞ্চলিক নির্বাচনী অফিস দখলের অভিযোগ উঠেছে, এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তবে তিনি কাজ করছেন তিনটি সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক হিসেবে। প্রতিদিনই প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তিনি, চাইছেন ভোট। তবে ভোট প্রার্থনা ও সমর্থনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে প্রকাশ্যে বিরোধে জাহিদ ও জাহাঙ্গীর। এখন একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় সমালোচনা করে বক্তব্য রাখছেন।
গণসংযোগে প্রতিমন্ত্রী রাসেল বলেন, জাহাঙ্গীর আলম যে ভাষায় প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে কথা বলে, তাতে মনে হয় তারা বিএনপির চেয়েও খারাপ। সমালোচনা করতে গিয়ে তারা মানুষের শারীরিক গঠন নিয়েও খারাপ মন্তব্য করে, এতে মনে হয় তারা অসুস্থ। প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, (স্বতন্ত্র) প্রার্থী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন ও সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা যে ভাষায় আমার সমালোচনা করছে বিএনপিও এই ভাষায় কথা বলেনি।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গোপনে ধারণ করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তিসংক্রান্ত জাহাঙ্গীর আলমের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার শাস্তি ও বহিষ্কার দাবিতে যে কয়জন জোরালো ভূমিকা রাখেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জাহিদ আহসান রাসেল। জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একপর্যায়ে হারান মেয়র পদও। পরে অবশ্য দল তাকে ক্ষমা করে। তবে সেখান থেকেই তাদের বিরোধের সূত্রপাত। সিটি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের মায়ের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। বাধা দেয়া হয় নির্বাচনী প্রচারণায়। সিটি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন বিজয়ী হলে জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ আরো তীব্র হয়। এখন সংসদ নির্বাচনে প্রায় প্রতিটি গণসংযোগ ও পথসমাবেশে জাহাঙ্গীর আলম ও জাহিদ আহসান একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন।
টঙ্গীর ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগে জাহিদ আহসানকে ইঙ্গিত করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মানুষের সেবা করার জন্য আমরা চারবার ভোট দিয়ে তাকে (জাহিদ আহসান) নির্বাচিত করেছিলাম। কিন্তু তিনি মানুষের সেবা না করে টঙ্গীকে মাদক দিয়ে সয়লাব করে দিয়েছেন। মানুষ এখানে কল কারখানা করতে গেলেও তাদের চাঁদা দিতে হয়। তারা চাচা গ্রুপ বানাইছে, ভাবি গ্রুপ বানাইছে, ভাইয়া গ্রুপ বানাইছে, ফুফু গ্রুপ বানাইছে। তাদের এই পরিবারতন্ত্র থেকে আমরা রক্ষা পেতে চাই।

গণসংযোগে নৌকার প্রার্থী জাহিদ আহসান রাসেল সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু মানুষ সব সময়ই ষড়যন্ত্র করে। আমার নির্বাচনী এলাকাও এর বাইরে নয়। সিটি করপোরেশনের টাকাকে কাজে লাগিয়ে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম সাহেব বিভিন্ন প্রলোভন দিচ্ছেন, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যা নির্বাচনী আচরণবিধিতে পড়ে না। এক প্রতিষ্ঠানের টাকা দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন করবেন তা হতে পারে না।
টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠে গণসংযোগ করার কথা ছিল আলিম উদ্দিন বুদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের। কিন্তু ফটকে তালা থাকায় তাদের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে ফটকের তালা ভেঙে মাঠের ভেতর প্রবেশ করে পথসভা করেন। এ ঘটনায় জাহিদ আহসানের বিরুদ্ধে প্রচারে বাধার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন কাজী আলিম উদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলম। সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পর আলিম উদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে গাজীপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ওই কলেজের এক শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর বুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে টঙ্গীতে মিছিলও করা হয়।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, জাহিদ ও জাহাঙ্গীরের বিরোধের কারণে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী বা ভোটাররা ভাগ হয়ে গেছেন। পাশাপাশি জাহিদ ও জাহাঙ্গীর একে অপরকে উদ্দেশ করে উসকানিমূলক বক্তব্য, বিষোদ্গার বা পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রার্থীদের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তার বৈঠকেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়।

এদিকে, গাজীপুর-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী সংরক্ষিত মহিলা এমপি রুমানা আলীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ট্রাক প্রতীকের মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ। এ আসনেও একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন নির্বাচনী প্রচারণায় বাধার। দুই এমপির লড়াইও হবে হাড্ডাহাড্ডি। কে জিতবে তা বলাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজীপুর-৪ আসন কাপাসিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে লড়ছেন নৌকা এবং ঈগল প্রতীক নিয়ে মামাতো বোন, ফুফাতো ভাই। যতই দিন ঘনিয়ে আসছে, ততই তাদের বিরোধ তুঙ্গে উঠছে। ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের উপদেষ্টা শিল্পপতি আলম আহমেদ প্রার্থী ফিরে পেয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামার পর পরই গত মঙ্গলবার নৌকার প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বঙ্গতাজ কন্যা হাইকোর্টের আপিল বিভাগে রিট করেছেন আলম আহমেদের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে। বোনের হয়ে প্রচারণায় নেমেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বঙ্গতাজের ছেলে সোহেল তাজ। এ আসনেও লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
এছাড়া গাজীপুর-৫ আসনে নৌকার প্রার্থী সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি কঠিন প্রতিদ্ব›দ্বিতার মুখে পড়ছেন নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাকসুর সাবেক ভিপি-জিএস ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সাবেক এমপি আখতার উজ্জামানের সঙ্গে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ট্রাক প্রতীকে লড়ছেন আখতার উজ্জামান। এ আসনের সঙ্গেও গাজীপুর সিটির তিনটি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন সংযুক্ত রয়েছে। আখতার উজ্জামানও সমর্থন পাচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলমের। এতে করে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি কঠিন লড়াইয়ে পড়েছেন ট্রাক প্রতীকের সঙ্গে। জাহাঙ্গীরের কারিশমায় এখানেও ঘটতে পারে ট্রাকের সঙ্গে নৌকার দুুর্ঘটনা।
স্থানীয়রা বলছেন, গাজীপুর-১, ২ ও ৫ আসন তিনটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখানে ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে জাহাঙ্গীর কারিশমা। ফলে সবার নজর জাহাঙ্গীর ও তার অনুসারীদের নিয়ে।

 

গাজীপুরে জমে উঠেছে নৌকার সঙ্গে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াই

আপডেট সময় : ১০:০০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩

গাজীপুর প্রতিনিধি :
গাজীপুরে ৫টি সংসদীয় আসনেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের লড়াই জমে উঠেছে। ফলে তীব্র হচ্ছে নৌকার সঙ্গে ট্রাক ও ঈগলের লড়াই। নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তীর। সংসদ সদস্য হিসেবে নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে বিরোধ বাড়ছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে। অনেক জায়গায় বিক্ষিপ্ত হামলা, পোস্টার ছেঁড়া, ভাঙচুর এবং প্রচারণায় বাধা দেয়া ও অফিস দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে গাজীপুর-১ ও ২ আসনের নৌকার প্রার্থী, মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রী এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই নির্বাচনে অন্তত ৪টি আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। গাজীপুর ১, ২, ৩ ও ৫ আসনের হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বত্র।

জানা গেছে, গাজীপুর-১ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮টি ওয়ার্ড নিয়ে এ আসন গঠিত। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য রেজাউল করিম রাসেল ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে রয়েছেন। সিটি করপোরেশনের ১৮টি ওয়ার্ড এ আসনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম সমর্থন দিয়েছেন রেজাউল করিম রাসেলকে। সিটি নির্বাচনের জাহাঙ্গীর কারিশমাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আশা করছেন রেজাউল। ট্রাক প্রতীকের প্রচারণায় বাধারও অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী তার দীর্ঘ ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং কালিয়াকৈরে তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বলেন, জাহাঙ্গীরকে তিনি গণনায় ধরেন না। ফলে সিটি এলাকার ভোটে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
গাজীপুর-২ আসনে নৌকার প্রার্থী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি তীব্র প্রতিদ্ব›দ্বিতার মুখে পড়েছেন নিজ দলের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন ও ঈগল প্রতীকের মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। সিটির ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর-২ আসন গঠিত। এখানেও জাহাঙ্গীর কারিশমা কাজে লাগাতে চাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন। তার পক্ষে জাহাঙ্গীর আলম ও তার সমর্থিত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী মাঠে নেমেছেন। ইতোমধ্যে ট্রাক প্রতীকের প্রার্থীর প্রচার অভিযানে একাধিকবার বাধা প্রদান, নির্বাচনী অফিস দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টঙ্গীর মাছিমপুরে ট্রাক প্রতীকের নির্বাচনী অফিসে হামলা ও টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠে প্রবেশের সময় গেটে তালা লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা ছাড়াও টঙ্গী টিএনটি গেট এলাকায় ট্রাক প্রতীকের আঞ্চলিক নির্বাচনী অফিস দখলের অভিযোগ উঠেছে, এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তবে তিনি কাজ করছেন তিনটি সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক হিসেবে। প্রতিদিনই প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তিনি, চাইছেন ভোট। তবে ভোট প্রার্থনা ও সমর্থনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে প্রকাশ্যে বিরোধে জাহিদ ও জাহাঙ্গীর। এখন একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় সমালোচনা করে বক্তব্য রাখছেন।
গণসংযোগে প্রতিমন্ত্রী রাসেল বলেন, জাহাঙ্গীর আলম যে ভাষায় প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে কথা বলে, তাতে মনে হয় তারা বিএনপির চেয়েও খারাপ। সমালোচনা করতে গিয়ে তারা মানুষের শারীরিক গঠন নিয়েও খারাপ মন্তব্য করে, এতে মনে হয় তারা অসুস্থ। প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, (স্বতন্ত্র) প্রার্থী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন ও সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা যে ভাষায় আমার সমালোচনা করছে বিএনপিও এই ভাষায় কথা বলেনি।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গোপনে ধারণ করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তিসংক্রান্ত জাহাঙ্গীর আলমের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার শাস্তি ও বহিষ্কার দাবিতে যে কয়জন জোরালো ভূমিকা রাখেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জাহিদ আহসান রাসেল। জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একপর্যায়ে হারান মেয়র পদও। পরে অবশ্য দল তাকে ক্ষমা করে। তবে সেখান থেকেই তাদের বিরোধের সূত্রপাত। সিটি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের মায়ের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। বাধা দেয়া হয় নির্বাচনী প্রচারণায়। সিটি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন বিজয়ী হলে জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধ আরো তীব্র হয়। এখন সংসদ নির্বাচনে প্রায় প্রতিটি গণসংযোগ ও পথসমাবেশে জাহাঙ্গীর আলম ও জাহিদ আহসান একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন।
টঙ্গীর ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগে জাহিদ আহসানকে ইঙ্গিত করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মানুষের সেবা করার জন্য আমরা চারবার ভোট দিয়ে তাকে (জাহিদ আহসান) নির্বাচিত করেছিলাম। কিন্তু তিনি মানুষের সেবা না করে টঙ্গীকে মাদক দিয়ে সয়লাব করে দিয়েছেন। মানুষ এখানে কল কারখানা করতে গেলেও তাদের চাঁদা দিতে হয়। তারা চাচা গ্রুপ বানাইছে, ভাবি গ্রুপ বানাইছে, ভাইয়া গ্রুপ বানাইছে, ফুফু গ্রুপ বানাইছে। তাদের এই পরিবারতন্ত্র থেকে আমরা রক্ষা পেতে চাই।

গণসংযোগে নৌকার প্রার্থী জাহিদ আহসান রাসেল সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু মানুষ সব সময়ই ষড়যন্ত্র করে। আমার নির্বাচনী এলাকাও এর বাইরে নয়। সিটি করপোরেশনের টাকাকে কাজে লাগিয়ে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম সাহেব বিভিন্ন প্রলোভন দিচ্ছেন, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যা নির্বাচনী আচরণবিধিতে পড়ে না। এক প্রতিষ্ঠানের টাকা দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন করবেন তা হতে পারে না।
টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠে গণসংযোগ করার কথা ছিল আলিম উদ্দিন বুদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের। কিন্তু ফটকে তালা থাকায় তাদের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে ফটকের তালা ভেঙে মাঠের ভেতর প্রবেশ করে পথসভা করেন। এ ঘটনায় জাহিদ আহসানের বিরুদ্ধে প্রচারে বাধার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন কাজী আলিম উদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলম। সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পর আলিম উদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে গাজীপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ওই কলেজের এক শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর বুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে টঙ্গীতে মিছিলও করা হয়।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, জাহিদ ও জাহাঙ্গীরের বিরোধের কারণে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী বা ভোটাররা ভাগ হয়ে গেছেন। পাশাপাশি জাহিদ ও জাহাঙ্গীর একে অপরকে উদ্দেশ করে উসকানিমূলক বক্তব্য, বিষোদ্গার বা পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। প্রার্থীদের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তার বৈঠকেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়।

এদিকে, গাজীপুর-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী সংরক্ষিত মহিলা এমপি রুমানা আলীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ট্রাক প্রতীকের মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ। এ আসনেও একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন নির্বাচনী প্রচারণায় বাধার। দুই এমপির লড়াইও হবে হাড্ডাহাড্ডি। কে জিতবে তা বলাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজীপুর-৪ আসন কাপাসিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে লড়ছেন নৌকা এবং ঈগল প্রতীক নিয়ে মামাতো বোন, ফুফাতো ভাই। যতই দিন ঘনিয়ে আসছে, ততই তাদের বিরোধ তুঙ্গে উঠছে। ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের উপদেষ্টা শিল্পপতি আলম আহমেদ প্রার্থী ফিরে পেয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামার পর পরই গত মঙ্গলবার নৌকার প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বঙ্গতাজ কন্যা হাইকোর্টের আপিল বিভাগে রিট করেছেন আলম আহমেদের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে। বোনের হয়ে প্রচারণায় নেমেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বঙ্গতাজের ছেলে সোহেল তাজ। এ আসনেও লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
এছাড়া গাজীপুর-৫ আসনে নৌকার প্রার্থী সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি কঠিন প্রতিদ্ব›দ্বিতার মুখে পড়ছেন নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাকসুর সাবেক ভিপি-জিএস ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং সাবেক এমপি আখতার উজ্জামানের সঙ্গে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ট্রাক প্রতীকে লড়ছেন আখতার উজ্জামান। এ আসনের সঙ্গেও গাজীপুর সিটির তিনটি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন সংযুক্ত রয়েছে। আখতার উজ্জামানও সমর্থন পাচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলমের। এতে করে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি কঠিন লড়াইয়ে পড়েছেন ট্রাক প্রতীকের সঙ্গে। জাহাঙ্গীরের কারিশমায় এখানেও ঘটতে পারে ট্রাকের সঙ্গে নৌকার দুুর্ঘটনা।
স্থানীয়রা বলছেন, গাজীপুর-১, ২ ও ৫ আসন তিনটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখানে ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে জাহাঙ্গীর কারিশমা। ফলে সবার নজর জাহাঙ্গীর ও তার অনুসারীদের নিয়ে।