শিশির ও আমেজে প্রাণবন্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
- আপডেট সময় : ০৯:২৪:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ ৩৭৬ বার পঠিত

মো. সাকিব আসলাম, ইবি প্রতিনিধি:
ঋতু বদলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আদলে সেজেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। মফিজ লেক সংলগ্ন ধানের শীষে বৃষ্টির মতো টিপ টিপ করে ঝরেছে শিশির। মৌসুমের এই সময়ে ঘন কুয়াশায় দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে জানান দিয়েছে শীতের কর্কশ বার্তা।
পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল নামে পরিচিতি লাভ করলেও আশ্বিন-কার্তিকের দিকে নিরবে শীত তার আগাম বার্তা জানিয়ে দেয়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে পরিমিত কুয়াশা, ইবির খেলার মাঠে দূর্বা ঘাসের মাথায় শিশিরের বৃহৎ ফোটা জানিয়ে দিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাড় কাঁপানো শীত এসেছে।
প্রকৃতিতে এই শীতের আমেজ শুরু হতেই ইবিতে রঙ বেরঙের অতিথি পাখির কলরবে মুক্ত বাংলা, মফিজ লেক, মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব, শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন অরণ্য প্রাঙ্গন মুখরিত। তবে এই শীতের তীব্রতা ভোগান্তির মানদণ্ড কতটুকু বাড়বে তা বলা মুশকিল। এ বছরে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের কারণে অতিথি পাখির আগমনী কোনো কলবর নাই। যেখানে প্রতি বছর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখির উপস্থিতি খবরের কাগজে উল্লেখযোগ্য শিরোনাম হতো সেখানে বর্তমান সময়ে এসব পাখির দেখা মেলা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে পাখিদের আবাসস্থল ও নান্দনিক গাছগুলো কাটা পড়েছে।
দুঃখের বিষয় শীতে মৌসুমে অনেক সময় বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব প্রকট হয়। শীতকাল আরামদায়ক হলেও বছরে এ সময়ে তুলনামূলক কিছু বাড়তি রোগব্যাধি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের এই সময়ে ঠাণ্ডাজনিত সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায়। যেমন কাশি, সাময়িক জ্বর, অ্যাজমার প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, কোল্ড অ্যালার্জি হয়ে থাকে। মেডিকেল সূত্রে জানা যায়, শতকরা ৪৬% ভাগ শিক্ষার্থীরা ঠান্ডাজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ সময় বাতাসে ধুলাকণার বেশি থাকায় অনেকে অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা যায়। শীতকালে মশাবাহিত ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু রোগ সহ নানা ভাইরাস জ্বরের রোগের প্রকোপ দেখা যায়। এ সময় অনেক স্থানে মশার প্রকোপও বাড়ে। ডেঙ্গু বর্ষাকালীন রোগ হলেও এখন শীতকালেও এটির বিস্তার দেখা যায়।
এ সময়ে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ক্যাম্পাসের প্রায় অনেক শিক্ষার্থীই ঠান্ডা-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। তবুও এই শীতের কুয়াশামাখা ভোরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে শিক্ষার্থীদের কোন বিড়ম্বনা নাই। ঘনকুয়াশার ভারী চাদরে ক্যাম্পাস হোটেলে গরম খিচুড়ির সাথে আলু ভর্তা, লংকার এক অনন্য স্বাদে শীতের আমেজের পূর্ণ তৃপ্তি নেয় শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে, জিয়া মোড়, ঝাল চত্বরে, বিভিন্ন টং দোকানে শিক্ষার্থীদের একসাথে চায়ের আড্ডার দৃশ্য সত্যিই প্রমাণ করে শীতও বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেনি এসব নিখাঁদ ভালোবাসার গভীর বন্ধনের। কর্কশ পরিবেশের এ প্রতিচ্ছবি শীতের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
ক্যাম্পাসে কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের মৃদু আলোতে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’ যেন শিক্ষার্থীদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ দীপ্তশিখায় উদীপ্ত শিক্ষার্থীরা শীতের আড়ষ্টতা ভেঙে ক্লাসরুমের সামনে বা বসার স্থানে শিক্ষকের অপেক্ষা করে।
এই ঘন কুয়াশা ও তীব্র শৈত্য প্রবাহের কারণে অসহায় দুস্থদের কাছে শীতের আবহাওয়া মুহূর্তেই যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠে। প্রতিটি হলে শীতবস্ত্র সংগ্রহ বক্স স্থাপন করা হয়। আশেপাশে অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে উদারচিত্তে শীতবস্ত্র প্রদান করে সকল হলের শিক্ষার্থীরা। এতে ক্যাম্পাস অভ্যন্তরীণ সেবা প্রদানকারী ভ্যানচালক, হোটেলের কর্মচারীসহ অনেকের শীত নিবারণের উষ্ণ অনুভূতির কারণ হয় শিক্ষার্থীবৃন্দ।
কিছু সুন্দর দৃশ্য এককের মতো হয়। যেমনটা দেখা যায় হলসম্মুখে, বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা অনুভবের ঢেকুর তুলে ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট সকল শ্রেণীর মানুষ।
শিক্ষার্থীরা বাঙালী সংস্কৃতি ধারণকারী শীতবস্ত্র যেমন চাদর ও অন্যান্য শীতসামগ্রী দ্বারা নিজেদের আবৃত করে নেয়। সেই সাথে তাদের নিজস্ব চাহিদার শীতবস্ত্র বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। সেখানে থাকে সৃজনশীল চিন্তার মিশ্রণ। এবং প্রাণে স্থান দেওয়া ক্যাম্পাসের লোগো। মনে হয় পরিচয়টা মুখে নয় এই শীতবস্ত্র দিচ্ছে।
বস্ত্র থেকে অনেক বেশি আগ্রহ থাকে পিঠা পুলির উৎসবে। কেননা ক্যাম্পাসে দেশের সর্বপ্রান্তের শিক্ষার্থী অবস্থান করে। তাই অঞ্চলভেদে পিঠার বৈচিত্র্য ভিন্ন হয়। বাসা থেকে আনা সেই ঐতিহ্যবাহী রকমারি পিঠা যেমন ডিম পোয়া, নারিকেল পুলি, ডিম সুন্দরী, ভেজা, পুলি, দুধ পুলি, সেমাই, ভাপা, ক্ষীরের পুলি, কেক, রিফ ঝাল, ঝাল ভাজা পুলি, কয়েন পুলি, মাংসের পাটি, চিকেন সবজি এমন সব বাহারি নামের ও ভিন্ন স্বাদের এসব পিঠার স্বাদ একসাথে বসে উপভোগ করার দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
কনকনে শীতে খেজুরের রস খেতে যাওয়া বলা যায় উৎসবের মতোই। ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় সন্ধ্যা, রাতে ও ভোরে রস খাওয়ার জন্য প্রতিযোগীতাও করে শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের সামনে, হলের সামনে শীতের মৌসুমে ফোটা বিভিন্ন ফুল তাদের সৌন্দর্য তারা স্থান করে নিয়েছে। যে দৃশ্য খুবই মনমুগ্ধকর।
ক্যাম্পাসের প্রায় রীতিমতো এই আনন্দঘন স্মৃতিগুলো ধরে রাখতে শিক্ষার্থীরা ছবি তোলায় মেতে উঠেন। প্রতিটি ঋতুতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভিন্নমাত্রায় নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পায় ১৭৫ একরের প্রতিটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও দর্শনার্থী। তবে শিক্ষার্থীরা শীতার্তদের যেভাবে বুকে টেনে কষ্টের পারদ নিম্নগামী করে তা হয়তো ব্যস্ত শহরে যান্ত্রিক মানুষের কাছে বোধগম্য হবে না।















