গরু পাচারের অভিযোগ তুলে ভারতে মুসলিমদের গুলি করে পঙ্গু করছে পুলিশ
- আপডেট সময় : ০২:৩৫:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পঠিত

ভারতে গরু পাচারের ‘কথিত’ অভিযোগে মুসলিমদের ওপর পুলিশের চালানো তাণ্ডব ও ‘কথিত’ বন্দুকযুদ্ধের নামে তাদের স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার রোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। উত্তর প্রদেশজুড়ে প্রায় একইভাবে আড়ালে এনে সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার এই পরিকল্পিত ছকটি দেশটিতে এখন ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।মূলত রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ও তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে এই বিচারবহির্ভূত নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকার কর্মী, আইনজ্ঞ ও বিরোধী নেতারা।এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের পুলিশের প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে একটি নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য দেখা যায়। যেখানে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক ব্যক্তি নিচের দিকে বাঁকা হওয়া বা খুঁড়িয়ে চলা পায়ে হাঁটছেন আর পুলিশ সদস্যরা তাকে কর্ডন করে নিয়ে যাচ্ছেন।বার্তা সংস্থাটি বলেছে, মূলত রাজ্যের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও গরু রক্ষা আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুলিশ গরু পাচারের মনগড়া অভিযোগ তুলে শত শত মুসলিমকে এই ধরনের তথাকথিত এনকাউন্টারে নিশানা করছে। পুলিশ এই ঘটনাগুলোকে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে দাবি করলেও আইনবিদ ও বিচারকরা বলছেন, এটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের আইনের শাসনকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।দিল্লিভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী মংলা বর্মা এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক উল্লেখ করে জানান, প্রক্রিয়াটি এখন পুলিশের নিয়মিত অনুশীলনে পরিণত হয়েছে। তদন্তের নামে আসামি ধরে সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দিয়ে মূল বিচার ব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ)-এর সংগৃহীত রেকর্ড থেকে জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশ পুলিশ গরু পাচারের অভিযোগে অন্তত ৬৫০ জন সন্দেহভাজনকে গুলি করে আহত করেছে। এপি স্বাধীনভাবে এর মধ্যে প্রায় ২০০টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখেছে, যার সিংহভাগ ভুক্তভোগীই মুসলিম।চমকপ্রদ তথ্য হলো, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আসামির শরীরের একটি নির্দিষ্ট স্থান অর্থাৎ হাঁটু বা তার নিচের অংশে গুলি চালানো হয়েছে।সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে যে ৬২৭টি ক্ষেত্রে সন্দেহভাজনদের পরিচয় জানা গেছে, তার মধ্যে শতকরা ৯৩ ভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের। ভারতের সার্বিক জনসংখ্যা ও পুলিশ বাহিনী যেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু, সেখানে গরু পাচারের নাম দিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে এভাবে নিশানা করাকে ‘প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নির্যাতন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন সিএসওএইচ-এর নির্বাহী পরিচালক রকিব নায়েক। তিনি বলেন, রাজ্য যন্ত্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এখন সরাসরি মুসলিম দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।অভিযোগের বিষয়ে উত্তর প্রদেশের উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ এপিকে বলেন, পুলিশ কেবল আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালায়। তিনি উদাহরণ টেনে দাবি করেন, জনসংখ্যার তুলনায় উত্তর প্রদেশে প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক কম। তবে আসামিদের পায়ে গুলি করার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা অস্বীকার করে তিনি জানান, নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। তবে বিগত এক বছরে কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে বলপ্রয়োগের জন্য শাস্তির আওতায় আনা হয়নি বলে জানান তিনি।উত্তর প্রদেশে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ বা আসামিকে বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার এই কৌশল কেবল গরু পাচারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন চুরি বা ধর্ষণের মতো অন্যান্য অপরাধে যুক্ত সন্দেহভাজনদের ওপরও প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভারতে পুলিশ কর্তৃক ভুয়া এনকাউন্টারে মেরে ফেলার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।মানবাধিকার কর্মীদের ধারণা, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এড়াতে পুলিশ এখন ‘হাফ এনকাউন্টার’ বা প্রাণে না মেরে পায়ে গুলি চালিয়ে পঙ্গু করার এই নতুন ফাঁদ পেতেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়নেই এই দমনপীড়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে।সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যোগী আদিত্যনাথ ২০১৭ সালের মার্চে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত এনকাউন্টারে অন্তত ৩১৬ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১০ জনই মুসলিম। উত্তর প্রদেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় (প্রতি পাঁচজনে একজন মুসলিম) এই নিহতের আনুপাতিক হার অনেক বেশি। এই একই সময়ে ১২ হাজার ৮৯০ জন আসামি পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনকালে ১৮ জন পুলিশ সদস্য নিহত ও ১ হাজার ৯৫৩ জন আহত হন।পুলিশ এই জিরো টলারেন্স নীতির কারণে অপরাধ কমেছে ও জনমনে স্বস্তি এসেছে বলে দাবি করলেও দেশটির সুশীল সমাজ ও আইনজীবীরা এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ হিসেবে দেখছেন। উত্তর প্রদেশের অ্যাক্টিভিস্ট ও বিরোধী নেতা সন্দীপ পাণ্ডে জানান, এসব ঘটনা সরাসরি দেশের সংবিধান ও আইনি ব্যবস্থাকে উপহাস করছে। এছাড়া উত্তর প্রদেশের বিজেপি থেকে শুরু হয়ে এই ট্রেন্ড এখন পার্শ্ববর্তী রাজ্য যেমন হরিয়ানা, বিহার, উত্তরাখণ্ড এবং রাজধানী দিল্লির সংলগ্ন এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে।আসামিরা পালিয়ে যাওয়ার সময় বা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়- এমন বিবরণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশ বারবার প্রচার করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিচার বিভাগ ভিন্ন কথা বলছে।আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক ড. মো. কলিম খান জানান, দৌড়ে পালানো বা আক্রমণের চেষ্টা করা কোনো ব্যক্তির পায়ের পিছনের মাংসপেশিতে হাড় না ছুঁয়ে একদম সমান্তরালভাবে গুলি লাগা বাস্তবে অসম্ভব। এটি দূর থেকে ছোঁড়া কোনো আত্মরক্ষার গুলি নয়, বরং কাছে এনে ইচ্ছাকৃতভাবে নেওয়া নিখুঁত শট।চলতি বছরের জানুয়ারিতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশের পুলিশের এই ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এক জামিন আবেদনের শুনানিতে উচ্চ আদালত স্পষ্ট জানান যে, পুলিশের এই পায়ে গুলি করার প্রবণতা একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।বিচারক উল্লেখ করেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও সস্তা জনপ্রীতি পাওয়ার আশায় পুলিশ নিজেদের ক্ষমতার মারাত্মক অপব্যবহার করছে। জুন মাসে অন্য এক বিচারক একে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের গতি অত্যন্ত ধীর।পুলিশের এই অমানবিক কৌশলের শিকার হয়ে অসংখ্য পরিবার আজ নিঃস্ব ও অসহায় দিন কাটাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পঙ্গু হয়ে পড়ায় তাদের জীবন কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনাহারে। অনেক পরিবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চিকিৎসা চালাচ্ছে, আবার অনেকে ভয়ে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছে না।সমালোচকরা বলছেন, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের মেরুকরণের রাজনীতি পুরো দেশকে হিন্দুত্ববাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গরুকে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিমদের কোণঠাসা করার এই রাজনৈতিক চাল দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।২০১৩ সালের তথ্যানুযায়ী উত্তর প্রদেশ পুলিশে মাত্র ৪.৮ শতাংশ মুসলিম সদস্য ছিল, যার পর থেকে সরকার এই বিষয়ক তথ্য প্রকাশ করাই বন্ধ করে দিয়েছে। দিনশেষে গো-সুরক্ষার নামে চলা এই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ভারতের গণতন্ত্র, বিচার বিভাগ ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে এক চরম ধ্বংসাত্মক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।সূত্র: দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট






















