চুয়াডাঙ্গায় জমে উঠেছে দেশের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের হাট:বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ৩৭ কোটি ৫০ লাখ
- আপডেট সময় : ০৯:৪৭:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৪ ২০৩ বার পঠিত

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
খেজুরের গুড় উৎপাদন ও বিক্রির জন্য ভরা মৌসুম চলছে। এরই মাঝে চুয়াডাঙ্গা সরোজগঞ্জে জমে উঠেছে দেশের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের হাট। তবে এবার গুড়ের সরবরাহ কম থাকলেও স্বাদে ও গন্ধে এখানকার গুড় অতুলনীয় হওয়ার পাশাপাশি নলের পাটালির দাম ও চাহিদা রয়েছে অনেক। তাইতো এ গুড় কিনতে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাটে মানুষের ভিড় জমে। গাছ থেকে সংগ্রহ করা রস জালিয়ে তৈরি করা হয় ঝালাগুড় ও নলেন পাটালি কেনা-বেচার জন্য গুড়ের এই হাটটি ঐতিহ্য কয়েক’শ বছরের।
জেলার সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের সরোজগঞ্জের চুয়াডাঙ্গা-ঢাকা মহাসড়ক ঘেঁষে স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে সপ্তাহের প্রতিদিন সোম ও শুক্রবার এ হাটটি বসে থাকেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে হাটে গুড়ের কেনা-বেচা।
চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে খেজুর গাছিরা তাদের গাছ কাটা ও রস সংগ্রহের সরঞ্জাম নিয়ে চলে যাচ্ছেন মাঠে। মাঠের চারদিকে খেজুর গাছের মাথার উপর ঝুলছে রসের ভাড়। সেই রসের ভাড় গাছিরা গাছ থেকে নিচে নামিয়ে রসের জালাতে জালিয়ে গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তীব্র শীতের কষ্ট উপেক্ষা করে তৈরি করছেন উৎকৃষ্ট মানের খেজুরের গুড়। গুড় তৈরি করে এই গুড় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সরোজগঞ্জ ঐতিহ্যবাহী গুড়ের হাটে। হাটটির চারপাশে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতা বিক্রেতাদের হাক ডাকে মুখরিত হচ্ছে। হাটে এবছর খেজুরের গুড় পাটালির চাহিদা থাললেও সরবরাহ কম থাকায় দামটা একটু বেশি। কারণ হিসেবে কৃষকসহ সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর এসময়ে ইটের ভাঁটা চালু হওয়ার ভাষাগুলো ইট পোড়ানোর আইন উপেক্ষা করে খেজুরর গাছও ক্রয় করছেন,দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা তাদের জীবন্ত খেজুর গাছ কেটে বিক্রি করছেন। দিন দিন উজাড় হচ্ছে রস তথা গুড় উৎপাদনের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছের নামটি।ফলে কমে যাচ্ছেন খেজুর গুড়ের সরবরাহ।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবছর চুয়াডাঙ্গা সদরে ৯৮ হাজার ৫’শ, আলমডাঙ্গায় ৪৫ হাজার ৫’১০, জীবননগর ৩৭ হাজার ৪’৫০ টি ও দামুড়হুদায় ৯ হাজার ২’শ টি গাছ।অর্থাৎ চুয়াডাঙ্গায় সবচেয়ে কম খেজুর গাছের সংখ্যা জেলার দামুড়হুদা উপজেলাতে।কারণ হিসেবে এ উপজেলাতে অবাধে কাটা হয় এ গাছটি।চুয়াডাঙ্গা জেলাতে সর্বমোট গাছের সংখ্যা রয়েছে, ২ লাখ ৭১ হাজার ৯’৬০ টি।এতে এ বছর গুড়ের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫’ শ মেট্রিক টন।এই লক্ষ্যমাত্রা গুড়ের বিক্রি পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। জেলাতে গাছ প্রস্তুতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় প্রায় ৩০ হাজর কৃষকের।দেশে গুড়ের চাহিদা ও সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রতিনিয়তই কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
হাট ইজারাদারসহ সংশ্লিষ্ট সুত্র বলছেন, চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ গুড়ের হাটটিতে সপ্তাহের দুইদিন প্রায় ২০-৩০ লাখ টাকার গুড় কেনাবেচা করা হয়। বগত বছর গুলোতে এ হাট থেকে কেনাবেচার পরিমাণ থাকেন ২৫-৩০ কোটি টাকা। এবছরে গুড়ের দাম বেশি থাকায় গুড় বিক্রির টাকার পরিমাণ বাড়বে। জেলাসহ আশপাশের জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা গুড় যেয়ে থাকেন রাজধানী ঢাকা সহ কুষ্টিয়া, মেহেরপুর,ঝিনাইদহ, পাবনা,বরিশাল, ময়মনসিংহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়,সিলেট, খুলনা,রংপুর রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। ফলে কৃষক সহ হাটমালিকরাও হচ্ছেন লাভবান।
হাটে গুড় বিক্রি করতে এসেছন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শৈলগাড়ি গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেম হোসেন।
তিনি এ প্রতিবদকে বলেন, তার আগে খেজুর গাছ ছিলো প্রায় ২’শ টির মতোন। এ কাজে অনেক কষ্ট থাকায় কিছু গাছ কেটে ফেলেছি, কিছু গাছ অন্যের কাছে রেখেছি। আর ৩০ টি গাছ নিজে করি।এ হাটে গুড় নিয়ে আসলে দাম ভালো পাওয়া যায়,সবচেয়ে বড় বিষয় নগদে বিক্রি করতে পারি।গুড় বিক্রি করে একসঙ্গে টাকা পেলে কাজে লাগানো যয়,আজকে ১৮০ টাকা করে ৩০ কেজি গুড় বিক্রি করলাম।
বরিশাল থেকে হাটে গুড় কিনতে এসেছেন আমজাদ হোসেন নামের এক ক্রেতা জানান, তিনি চুয়াডাঙ্গার এই হাটটিতে এসে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক সহ সকল গুড় ব্যবসায়ীদের কাছে গুড় কিনে নিয়ে ট্রাকযোগে নিজ দেশে নিয়ে যায়। চুয়াডাঙ্গার এই ঐতিহ্যবাহী হাটের গুড়ের কদর থাকায় এখান থেকে গুড় কিনে নিয়ে যায়,এতে কৃষক সহ আমরাও লাভবান হচ্ছি।তিনি আরও বলেন,গুড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রায় ১৩ বছর জড়িয়ে, সংসারের অর্থনৈতিক চাহিদা মিটিয়ে আসছি।
জেলার দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের মিন্টু নামের এক গুড় বিক্রিতার সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমাদের জেলার গুড়ের চাহিদা প্রচুর। তবে আগের চেয়ে গাছের সংখ্যা কম থাকায় গুড় উৎপাদন কম হচ্ছে। এ কাজে প্রচুর কষ্ট থাকা আর গুড়ের দাম কম থাকায় অনেক গাছ কেটে ফেলেছে। আগের সময় কৃষকের জমির আইল, পতিতজমি, পুকুর পাড়, বাড়ির আঙ্গিনাসহ বিভিন্ন স্থানে খেজুর গাছের দেখা মিললেও তা আর চেখে পড়েন না। জেলার এ উপজেলাতে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় গুড় উৎপাদন কম। তবে এ গত কয়েক বছর গুড়ের দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে, কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয়ের উপপরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, জেলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়ের হাটটি আমাদের জেলার সরোজ গঞ্জে অবস্থিত। এখানে সপ্তাহের দুদিন সোমবার ও শুক্রবার দিনভর কেনা বেচা চলে। তবে এবারে এই হাটে গুড়ের চাহিদা বেশি রয়েছে, তবে সরবরাহ কম।তবে জেলার সকল উপজেলাাতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা গুেেড়র চাহিদা পূরণ করার জন্য সকল পর্যায়ের কৃষকদের মাঝে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।















