ফিফার কাছ থেকে গোপনে ১৭ লাখ ডলারের বেশি নিয়েছেন ইনফান্তিনো!
- আপডেট সময় : ০৩:২০:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পঠিত

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বে থাকা সংস্থার কাছ থেকে ২০২৪ সালে অতিরিক্ত ১৭ লাখ ২০ হাজার ডলার (প্রায় ২১ কোটি ২২ লাখ টাকা) পেয়েছেন। তবে এই অর্থ পাওয়ার তথ্য ফিফার বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি। ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিসেবার (আইআরএস) নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ফিফার স্বচ্ছতা ও নিজস্ব বিধি অনুসরণের প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবছর জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করসংক্রান্ত নথি আইআরএস ফরম ৯৯০-এ ইনফান্তিনোর অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের তথ্য উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ফিফার গঠিত সংস্থা এফডব্লিউসি২০২৬ থেকে ১৭ লাখ ২০ হাজার ডলার পান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থাটি ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।
এই অর্থ ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর নিয়মিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বাইরে। ফিফার ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে তিনি পেয়েছেন ৪২ লাখ ৭৪ হাজার সুইস ফ্রাঁ, যা প্রায় ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের (প্রায় ৬০ কোটি টাকা) সমান।
অর্থাৎ, ফিফার কাছ থেকে নিয়মিত পারিশ্রমিক পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বে থাকা সংস্থার কাছ থেকেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ পেয়েছেন ইনফান্তিনো। কিন্তু অতিরিক্ত এই পারিশ্রমিক ফিফার ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এফডব্লিউসি২০২৬-এর সর্বশেষ প্রকাশ্য আইআরএস ফরম ৯৯০-এ অবশ্য অর্থ প্রদানের তথ্য রয়েছে।
ফিফার বিধিতে কী বলা আছে
ফিফার সংবিধির ৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ১৩ নম্বর ধারায় সভাপতি, কাউন্সিলের সদস্য এবং মহাসচিবের পারিশ্রমিক নির্ধারণ ও প্রকাশের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, ফিফার পারিশ্রমিকবিষয়ক উপকমিটি সভাপতি, কাউন্সিলের সদস্য এবং মহাসচিবের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করবে। তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পারিশ্রমিকের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
ইনফান্তিনোর অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার তথ্য প্রকাশ না করায় এই বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ফিফা কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ বিষয়ে ইএসপিএনের সঙ্গে খুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হলে ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, সংস্থাটি সব ধরনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলে। ফিফার সংবিধি লঙ্ঘনের কোনো ইঙ্গিতও তারা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
ইনফান্তিনোর অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস। একই সঙ্গে ফিফার বিধি লঙ্ঘনের সম্ভাব্য বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ফিফার সাবেক গভর্ন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান মিগেল মাদুরো দ্য টাইমসকে বলেন, ফিফার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সভাপতি অতিরিক্ত অর্থ পেলে এবং সেই অর্থের তথ্য প্রকাশ করা না হলে তা বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মাদুরোর ভাষ্য, ফিফার সংবিধিতে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পারিশ্রমিকবিষয়ক উপকমিটিরও অন্য কোনো পদ্ধতিতে দেওয়া পারিশ্রমিকের তথ্য গোপন রাখার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। ইনফান্তিনোকে যথেষ্ট ভালো পারিশ্রমিক দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে সেটি অবশ্যই স্বচ্ছতার সঙ্গে হতে হবে।
ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়
অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের তথ্য প্রকাশ না হওয়ার ঘটনা ইনফান্তিনোকে ঘিরে চলমান বিতর্কের সর্বশেষ সংযোজন। এর আগে চলতি বছর বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ মালিকানা বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির একটি পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসে। ‘ফুটবল ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’ নামে ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত উদ্যোগে বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্বে থাকার কথা ছিল জশুয়া কুশনারের।
জশুয়া কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ছোট ভাই। এবারের বিশ্বকাপের আগে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন ইনফান্তিনো। নিয়মিত হোয়াইট হাউসেও যাতায়াত ছিল তাঁর।
এই পরিস্থিতিতে উয়েফা, কনক্যাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) প্রধানেরা ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেন। এমনকি ভবিষ্যতে ফিফার আয়োজিত প্রতিযোগিতা বয়কট করার হুমকিও দিয়েছিল উয়েফা। তবে সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়।
পরে তিন কনফেডারেশনের প্রধানদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন ইনফান্তিনো। এ লক্ষ্যে একটি চিঠিতে সদস্য দেশগুলোর ফুটবল সংস্থাগুলোকে ১ কোটি ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হন তিনি।
বিশ্বকাপের ম্যাচে শাস্তি নিয়েও সমালোচনা
বিশ্বকাপ চলাকালে শৃঙ্খলাসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েন ইনফান্তিনো। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড ও পরবর্তী ম্যাচে খেলার অনুমতি দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে ২-০ গোলে জেতে যুক্তরাষ্ট্র। ওই ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী, পরের রাউন্ডে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে তাঁর নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল।
কিন্তু ট্রাম্প ইনফান্তিনোকে ফোন করে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পর বালোগানকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দিয়ে পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার সুযোগ পান তিনি। যদিও সেই ম্যাচে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
এ ঘটনাতেও ইনফান্তিনোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়। সর্বশেষ অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের তথ্য প্রকাশ না হওয়ার ঘটনা ফিফা সভাপতির নেতৃত্ব, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কাউন্সিলের পরবর্তী সভা হওয়ার কথা। অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই সভার দিকেও নজর থাকবে ফুটবল বিশ্বের।


















