ঢাকা ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ভিভো ভি৮০ লাইটঃ প্রি-অর্ডারে ভিভো-এপেক্সের বিশেষ উপহার Logo জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি চাপ, ২০২৬ সালে খরচ বাড়তে পারে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা Logo গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৪৮ বছরে বিএনপি বড়ইয়া ইউনিয়নে বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন Logo ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অসুস্থ: হাসপাতালে দেখতে গেলেন রাষ্ট্রপতি Logo বিশ্বের প্রথম বাজার হিসেবে বাংলাদেশে উন্মোচিত হলো টেকনো ক্যামন স্লিম ৫জি সাথে এসেছে টেকনো ক্যামন এয়ার Logo লিওনেল মেসিকে ধন্যবাদ জানালেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো, বললেন অবিস্মরণীয় স্মৃতির জন্য কৃতজ্ঞ Logo এআইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ছেন যারা, টাইমের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ Logo দীর্ঘ আন্দোলনের পথ পেরিয়ে দেশে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী Logo টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত সফর নিয়ে অজানা তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত তামিম ইকবালের Logo চলন্ত বাসে ১৬ বছরের কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ২

জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি চাপ, ২০২৬ সালে খরচ বাড়তে পারে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০২:৫৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লার দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে আগামী বছর বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সমান।

জ্বালানি আমদানিতে এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ এবং টাকার বিনিময়মূল্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছরে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বাড়তি এ অর্থের পরিমাণ দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

জ্বালানি ব্যয়ে চাপ বাড়লে কমতে পারে আমদানি সক্ষমতা

জেডসিএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। এর ফলে দেশের আমদানি কভারেজ বর্তমান ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে কমে ৫ দশমিক ২ মাসে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই অর্থ দিয়ে দেশে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এই পরিমাণ নতুন সৌরবিদ্যুৎ দেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে প্রায় ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত সক্ষমতা যোগ করতে পারে।

এলএনজি কম এসেছে, কিন্তু কমেনি ব্যয়ের আশঙ্কা

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। তবে জুলাই ও আগস্ট মাসে আমদানিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা যায়।

হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এই দুই মাসে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

জেডসিএর তথ্য বলছে, জুলাই মাসে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করা হলেও আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টনে। আমদানির পরিমাণ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সামগ্রিক ব্যয় কমার পরিবর্তে উল্টো বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি বিদ্যুৎ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গত ১১ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। ওই সময় এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশের সমান ছিল।

গ্যাস সংকটে চাপে শিল্প ও কৃষি

জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব দেশের শিল্প ও কৃষি উৎপাদনেও পড়ছে।

জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় হয় বন্ধ রয়েছে, নয়তো সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকার কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

এ ছাড়া দেশের কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতাকে চিহ্নিত করেছে জেডসিএ।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৩ সালে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৬ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানির সম্পর্ক ছিল।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে এসেছে। ফলে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যেকোনো ধরনের সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুটি স্পট কার্গো অনুমোদনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও আটটি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জ্বালানি চাহিদা পূরণে ভারত থেকেও অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও পুরোপুরি দূর হচ্ছে না ঝুঁকি

ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও করছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার জন্য একটি চুক্তি করা হয়েছে।

তবে জেডসিএর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি থাকলেও জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। কারণ আন্তর্জাতিক সংঘাত, নৌপথের সমস্যা বা অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের সময় চুক্তিবদ্ধ জ্বালানি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা থাকে না।

বর্তমান সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশের তিনটি বড় এলএনজি সরবরাহকারী চুক্তির আওতায় সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এলএনজিনির্ভরতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন খান মনে করেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত জ্বালানি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তার মতে, বৈশ্বিক সংকটের সময় সরবরাহ চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ে জাহাজে করে গ্যাস দেশের বন্দরে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে এলএনজির ব্যয় ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমও মনে করেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

তার হিসাবে, পরিকল্পিত নতুন এলএনজি টার্মিনালগুলো চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি বছরে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে এতে বছরে প্রায় ৮৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

তার মতে, এত বেশি আমদানিনির্ভরতা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের শিল্প খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানি ব্যয় কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে জেডসিএ।

২০২৫ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে। একই বছরে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৯ গিগাওয়াট।

আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আমদানিকৃত জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করতে হলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে।

কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে নির্মাণাধীন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩৫৮ মেগাওয়াট। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বর্তমান গতির চেয়ে অনেক দ্রুত নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু বিদেশ থেকে আরও বেশি জ্বালানি আমদানি করা নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি টেকসই ও নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।

ট্যাগস :

জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি চাপ, ২০২৬ সালে খরচ বাড়তে পারে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০২:৫৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লার দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে আগামী বছর বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সমান।

জ্বালানি আমদানিতে এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ এবং টাকার বিনিময়মূল্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছরে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বাড়তি এ অর্থের পরিমাণ দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

জ্বালানি ব্যয়ে চাপ বাড়লে কমতে পারে আমদানি সক্ষমতা

জেডসিএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। এর ফলে দেশের আমদানি কভারেজ বর্তমান ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে কমে ৫ দশমিক ২ মাসে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই অর্থ দিয়ে দেশে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এই পরিমাণ নতুন সৌরবিদ্যুৎ দেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে প্রায় ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত সক্ষমতা যোগ করতে পারে।

এলএনজি কম এসেছে, কিন্তু কমেনি ব্যয়ের আশঙ্কা

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। তবে জুলাই ও আগস্ট মাসে আমদানিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা যায়।

হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এই দুই মাসে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

জেডসিএর তথ্য বলছে, জুলাই মাসে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করা হলেও আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টনে। আমদানির পরিমাণ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সামগ্রিক ব্যয় কমার পরিবর্তে উল্টো বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি বিদ্যুৎ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গত ১১ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। ওই সময় এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশের সমান ছিল।

গ্যাস সংকটে চাপে শিল্প ও কৃষি

জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব দেশের শিল্প ও কৃষি উৎপাদনেও পড়ছে।

জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় হয় বন্ধ রয়েছে, নয়তো সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকার কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

এ ছাড়া দেশের কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতাকে চিহ্নিত করেছে জেডসিএ।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৩ সালে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৬ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানির সম্পর্ক ছিল।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে এসেছে। ফলে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যেকোনো ধরনের সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুটি স্পট কার্গো অনুমোদনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও আটটি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জ্বালানি চাহিদা পূরণে ভারত থেকেও অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও পুরোপুরি দূর হচ্ছে না ঝুঁকি

ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও করছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার জন্য একটি চুক্তি করা হয়েছে।

তবে জেডসিএর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি থাকলেও জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। কারণ আন্তর্জাতিক সংঘাত, নৌপথের সমস্যা বা অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের সময় চুক্তিবদ্ধ জ্বালানি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা থাকে না।

বর্তমান সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশের তিনটি বড় এলএনজি সরবরাহকারী চুক্তির আওতায় সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এলএনজিনির্ভরতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন খান মনে করেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত জ্বালানি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তার মতে, বৈশ্বিক সংকটের সময় সরবরাহ চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ে জাহাজে করে গ্যাস দেশের বন্দরে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে এলএনজির ব্যয় ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমও মনে করেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।

তার হিসাবে, পরিকল্পিত নতুন এলএনজি টার্মিনালগুলো চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি বছরে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে এতে বছরে প্রায় ৮৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

তার মতে, এত বেশি আমদানিনির্ভরতা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের শিল্প খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানি ব্যয় কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে জেডসিএ।

২০২৫ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে। একই বছরে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৯ গিগাওয়াট।

আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আমদানিকৃত জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করতে হলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে।

কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে নির্মাণাধীন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩৫৮ মেগাওয়াট। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বর্তমান গতির চেয়ে অনেক দ্রুত নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু বিদেশ থেকে আরও বেশি জ্বালানি আমদানি করা নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি টেকসই ও নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।