আতঙ্ক-উচ্ছ্বাস দুই নিয়েই অপেক্ষায় বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৩:০৪:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩৬ বার পঠিত

দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার এই বিশাল প্রকল্পটি দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট থেকে দেশের ১৭০ মিলিয়ন মানুষকে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দেবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দেশের প্রথম এই পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে একদিকে যেমন রয়েছে চরম উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে রয়েছে আতঙ্ক। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহিদুল হাসান বলেন, ‘কেন্দ্রটির প্রথম রিয়্যাক্টর চলতি বছরের শেষের দিকে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি এক বছরের মধ্যে কার্যকর হবে।’ এটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে, যা বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকটের এই সময়ে অর্থনীতিকে বেশ বেগবান করবে বলেও জানান জাহিদুল হাসান।
প্রকল্পটি কেন্দ্র করে এক সময়ের নীরব রূপপুর পরিণত হয়েছে প্রাণবন্ত এলাকায়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা ‘রোসাটম’-এর সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের হাত ধরে এখানে গড়ে উঠেছে এক অনন্য রুশ সংস্কৃতি। স্থানীয় দোকানপাট ও রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে রুশ ভাষা। স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি অনেক রেস্তোরাঁয় মিলছে রাশিয়ান ঐতিহ্যবাহী ‘বর্শ’ সুপ।
রূপপুর প্রকল্পের ফলে হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলেছে। গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য। উদাহরণস্বরূপ, ২৮ বছর বয়সী মো. ইমন খান ঢাকার তৈরি পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজ এলাকা রূপপুরে ফিরে এসেছেন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিকদের কাছে ফল ও শাকসবজি বিক্রি করছেন। ইমন খান বলেন, ‘আমি সামান্য রুশ ভাষা বলতে পারি, আর তারাও কিছুটা বাংলা বলতে পারে।’ রুশ ইন্সটলেশন টেকনিশিয়ান আলেকজান্দার ভ্লাদিমিরোভিচ স্কভোর্তসোভ জানান, তার সামনে তুরস্ক অথবা বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ ছিল। তিনি রূপপুরকে বেছে নেন এবং ২০২৪ সালে সপরিবারে এখানে চলে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন প্রথম রূপপুরের নির্মাণকাজটি দেখেছিলাম, তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে এই প্রকল্পে অনেক কাজ বাকি আছে। সত্যি বলতে, রূপপুর আমার জীবন ও চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে।’
স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই কেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কাজের স্বপ্ন। ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাফিজ বলেন, ‘আমাদের এলাকা পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে এতে আমরা আনন্দিত। আমার বন্ধুরা এবং আমি আশা করি প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে এই কেন্দ্রেই কাজ করতে পারব।’
তবে সবাই এখনো এই প্রকল্প নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা দূরত্বের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী সাবেক কাগজ কল শ্রমিক মো. ইউনুস আলী জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা অনেক আগে থেকেই ছিল। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে তারা বিকট শব্দে একটি কম্প্রেসার পরীক্ষা করেছিল। ঘুমিয়ে থাকা শিশুরাও ভয়ে জেগে উঠেছিল। আমি এখন বৃদ্ধ, আমার নিজের জীবনের ভয় নেই। কিন্তু আমার সন্তান ও নাতি-নাতনি রয়েছে, আমি তাদের নিরাপত্তা চাই।’
এদিকে, রূপপুর কর্তৃপক্ষের দাবি, সমস্ত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং পূর্বের পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিক্ষাগুলো এই প্রকল্পে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।
আবার রয়েছে এ ঘটনার উল্টোচিত্রও। বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ বাংলাদেশির জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রূপপুর আসলে কবে নাগাদ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। ৫৫ বছর বয়সী কৃষক বেলী বেগম বলেন, ‘আমি চাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দ্রুত চালু হোক এবং আমরা যেন এর পূর্ণ সুবিধা পাই। আমার ঘরের কাছেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাই আশা করি আমরা ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাব।’
উল্লেখ্য, রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম গ্রহণ করা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ফ্রান্স, সৌদি আরব, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। অবশেষে ২০১৫ সালে রাশিয়ার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১৭ সালে এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
তবে কোভিড-১৯ মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সরঞ্জাম পরিবহনে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বেশ কয়েকবার পিছিয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রকল্পটিকে ঘিরে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।




















