
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় এক ভয়াবহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি একই রাতে তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্য ও স্বজনও প্রাণ হারান।
শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সেদিন নিহত হন তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এবং পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসেরও। বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তাঁকে রক্ষা করতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল, এসবি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান ও সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হকও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
একই রাতে বঙ্গবন্ধুর ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনির বাসভবনেও হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় শেখ মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি নিহত হন। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনেও হামলা হয়। সেখানে সেরনিয়াবাতসহ তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও স্বজন নিহত হন।
১৫ আগস্টের আগে কয়েক সপ্তাহে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্থির। বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং গঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল। একই সময়ে চারটি ছাড়া দেশের অন্যান্য সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, চোরাচালান, লুটপাট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের তৎপরতা এবং সরকারের পাল্টা অভিযানের কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই প্রশাসন ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ত্রাণসামগ্রী ও খাদ্যশস্যের একটি অংশ চুরি বা লুট হওয়ার অভিযোগও সে সময় বিভিন্ন সংবাদ ও স্মৃতিকথায় উঠে আসে।
দুর্নীতি ও চোরাচালান ঠেকাতে সরকার একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায়। তবে এসব অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার বিরোধ তৈরি হয় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে বলে দাবি করা হয়।
১৯৭৫ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচারের ঘটনাও সংবাদপত্রে গুরুত্ব পায়। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে খাদ্যশস্য পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।
দুর্ভিক্ষের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে। বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যার খবর সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছিল। ট্রেন ও নৌযানেও ডাকাতির ঘটনা ঘটছিল বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
১৫ আগস্টের মাত্র কয়েক দিন আগে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ডাকাতির ঘটনায় গুলিতে দুই যাত্রী নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এমন ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সে সময় বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের তৎপরতাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সর্বহারা পার্টিসহ কয়েকটি সংগঠনের বিরুদ্ধে পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়।
অভিযানগুলোতে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে চরমপন্থিদের নিহত হওয়ার খবরও নিয়মিত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো। ১৩ আগস্ট, বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র দুই দিন আগে, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অভিযানের সময় চারজন চরমপন্থি নিহত ও একজন গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৭৪ সালের খাদ্যসংকটের প্রভাব তখনও পুরোপুরি কাটেনি। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের মধ্যেই ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি দেশের বিভিন্ন এলাকায় খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। বৃষ্টির অভাবে আউশ ধানের ক্ষতির খবর প্রকাশিত হয়।
এর কিছুদিন পর অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। এতে কৃষি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়। বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপও দেখা দিয়েছিল।
তৎকালীন বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও বর্ণনায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষের কথাও উঠে এসেছে। একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিস্থিতি, একদলীয় শাসনব্যবস্থা, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ভূমিকা এবং রক্ষী বাহিনীর সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে এসব বর্ণনায় দাবি করা হয়।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে পদ ও দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ এবং কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত বা অবসর দেওয়ার ঘটনাও অসন্তোষ বাড়িয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।
রক্ষী বাহিনীকে ঘিরে সেনাবাহিনীর মধ্যে নানা ধরনের সন্দেহ ও গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব বিষয় সামগ্রিকভাবে সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথায় বর্ণনা পাওয়া যায়।
সরকারের ভেতরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়। জুলাইয়ের শেষদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। দুর্নীতির অভিযোগে কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেপ্তারের খবর তখনকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।
একই সময়ে তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের বিরুদ্ধেও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং প্রশাসনে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যেই একদল সেনা কর্মকর্তা সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করতে থাকেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উঠে এসেছে। পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ও মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদের নাম উল্লেখ করা হয়।
তাঁরা আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মেজর শরীফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, আজিজ পাশা ও সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানসহ কয়েকজন পরে অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদার নামও এ ঘটনায় উঠে আসে।
পরিকল্পনাকারী কর্মকর্তারা কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত।
১৫ আগস্টের অভিযানের আগের দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল বলে পরবর্তী তদন্ত ও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর নিয়মিত সামরিক মহড়ার কথা বলে সেনানিবাসে অস্ত্র, যানবাহন ও সৈন্যদের প্রস্তুত করা হয়।
রাত পেরিয়ে ১৫ আগস্ট ভোরে অভ্যুত্থানকারী সেনাসদস্যরা বিভিন্ন লক্ষ্যে অভিযান চালান। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে হামলার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।
১৫ আগস্টের আগে শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর আরও একটি হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে মার্কিন কূটনৈতিক নথির উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের মে মাসে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার সময় তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছিল বলে ওই নথিতে দাবি করা হয়। তবে হামলার বিস্তারিত ও এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তা স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান। সে সময় তাঁরা দেশের বাইরে, বেলজিয়ামে অবস্থান করছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। কয়েকজন দণ্ডিত আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও কিছু আসামি বিদেশে অবস্থান করায় তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল বহুস্তরীয় সংকটে ঘেরা। দুর্নীতি ও খাদ্যসংকট থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চরমপন্থিদের তৎপরতা, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ—বিভিন্ন কারণ মিলিয়ে দেশ তখন এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই পটভূমিতেই সংঘটিত হয় ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ড।