মনিরুজ্জামান মনির, স্টাফ রিপোর্টারঃ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও রোগী হয়রানির একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী, স্বজন এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাকে দ্রুত অপসারণ করে একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ। রোগীর সেবা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা, সরাইল, আশুগঞ্জ, কসবা, নবীনগর, আখাউড়া, নাসিরনগরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও দূর দুরান্ত থেকে হাজারো মানুষ চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে আসেন। ফলে সরকারি এই হাসপাতালটি জেলার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা না পেয়ে প্রতিদিনই অনেক রোগীকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও আশপাশে দালালদের অবাধ বিচরণ নিয়েও দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকার পরও বিভিন্ন কারণে তাদের বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বলা হয়। ল্যাবরেটরি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ, হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্তের নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নমুনা সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত ডিসপোজেবল কাপ সরবরাহ না করে একই কাপ বারবার ধুয়ে ব্যবহারের মতো অনিয়ম করা হচ্ছে। এতে পরীক্ষার নমুনা দূষিত হওয়ার পাশাপাশি রিপোর্টের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের ল্যাবরেটরির নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, সরঞ্জামের মজুত ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, কিছু চিকিৎসক নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হন না। আবার কেউ কেউ দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয় তত্ত্বাবধায়কের নজরে থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি কিছু চিকিৎসক ও কর্মচারীর অনিয়মিত উপস্থিতি বা ছুটির বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও করেছেন তারা। তবে এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য চিকিৎসকদের হাজিরা রেজিস্টার, বায়োমেট্রিক তথ্য, ডিউটি রোস্টার ও ছুটির নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভুয়া ভাউচার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালীর বিরুদ্ধে হাসপাতালের বিভিন্ন খাতে ভুয়া ভাউচার, সরকারি অর্থের অপব্যবহার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেন, বিভিন্ন বিভাগে মাসিক অর্থ লেনদেনের একটি ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি মঞ্জুর, দায়িত্ব পালনে ছাড় কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হলে হাসপাতালের ক্রয়-বিক্রয়, ভাউচার, টেন্ডার, বিল ও হিসাবের নথি অডিট করা জরুরি। ময়নাতদন্ত ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়েও অভিযোগ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের কাজ নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ময়নাতদন্তসংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল ও কার্যক্রমে অনৈতিকভাবে অর্থ নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখার অনুমতি দেওয়া এবং সেখান থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন। হাসপাতালের ভেতরের বিভিন্ন দোকান থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এক্স-রে ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের এক্স-রে ফিল্মসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংকট দেখিয়ে রোগীদের বাইরে পাঠানো হয়। অন্যদিকে হাসপাতালে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকলেও সময়মতো মেরামত করা হয় না বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—সরকারি বরাদ্দ ও বাজেট থাকার পরও যদি রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়, তাহলে সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে? পূর্বের কর্মস্থল নিয়েও আলোচনা ডা. রতন কুমার ঢালী এর আগে ঝালকাঠির সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাকে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাকে ওএসডি করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সে সময় ডা. রতন কুমার ঢালী অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছিলেন, বিভাগীয় কমিশনারের হাসপাতালে আসার বিষয়টি তাকে জানানো হয়নি। ফলে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপটও পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক ডা:রতন কুমার ঢালী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে যোগদান করেন। এখনো বহাল তবিয়তে তিনি সেখানে কর্মরত আছেন। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ, বর্তমান কর্মস্থলেও তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ভুক্তভোগী রোগীদের অভিযোগ সরকারী ঔষধ আমরা পাইনা। এই সরকারি বরাদ্দকৃত ঔষধ কোথায় যায়? তাদের দাবি, চলতি বছরেই তিনি দীর্ঘ সময় কর্মস্থলের বাইরে ছিলেন এবং প্রায় ৮০ দিনের বেশি অবৈধ ছুটি ভোগ করেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি ছুটির অনুমোদনপত্র, অফিস আদেশ ও হাজিরা সংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তের দাবি সচেতন নাগরিকদের, সচেতন নাগরিকদের বক্তব্য, একটি সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে এতগুলো অভিযোগ ওঠার পরও যদি কার্যকর তদন্ত না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে দাবি জানিয়েছেন— হাসপাতালের গত কয়েক বছরের সব ক্রয় ও ব্যয়ের হিসাব অডিট করতে হবে;
ভাউচার ও বিল-ভাউচারের সত্যতা যাচাই করতে হবে। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের হাজিরা ও ছুটির হিসাব পরীক্ষা করতে হবে।
ল্যাবরেটরির নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা পদ্ধতি তদন্ত করতে হবে। হাসপাতালের ভেতরের দোকান ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে হবে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, ময়নাতদন্তসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। “সৎ ও যোগ্য তত্ত্বাবধায়ক চান মানুষ” সচেতন নাগরিকদের দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এমন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রয়োজন, যিনি প্রশাসনিকভাবে দক্ষ, রোগীবান্ধব এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন।
তাদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে ডা. রতন কুমার ঢালীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে তাকে অপসারণ করতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরকারি এই প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডা. রতন কুমার ঢালীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।