‘আমাদের পর্দায়, আমাদের ছবি’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে শিক্ষার্থীদের চলচ্চিত্র উৎসব ‘৩৫ মিলিমিটার-২০২৬’। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আয়োজিত প্রদর্শনীতে শিক্ষার্থীদের নির্মিত ২০টি চলচ্চিত্র দেখানো হয়। প্রদর্শনী শেষে অংশ নেওয়া সব নির্মাতাকে সম্মানসূচক সনদ দেওয়া হয়।
উৎসবে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ও ডিজাইনার নাহিদ মাসুদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শব্দ ডিজাইনার শারমিন ডোজা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও শিক্ষক লাবিব নাজমুছ ছাকিব এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাতিমা বাশার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির মেন্টর ও ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারপার্সন প্রফেসর ড. শাহ্ মো. নিস্তার জাহান কবীর।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্যে প্রফেসর ড. শাহ্ মো. নিস্তার জাহান কবীর বলেন, অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীরা যে আয়োজন করেছে, তা তাকে বিস্মিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ঘাটতি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের ভালো লাগা তৈরি করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক বিভিন্ন আয়োজন করার প্রত্যাশাও জানান।
বিশেষ অতিথি ড. ফাতিমা বাশার শিক্ষার্থীদের নির্মিত চলচ্চিত্র দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, নির্মাণগুলোকে কেবল শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ হিসেবে মনে হয়নি; বরং এতে পেশাদার নির্মাণশৈলীর ছাপ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা দেখে তিনি আশাবাদী ও আনন্দিত বলেও জানান।
সাউন্ড ডিজাইনার নাহিদ মাসুদ বলেন, এই উৎসবের মধ্য দিয়ে ফিল্মের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কাজের প্রকৃত যাত্রা শুরু করেছে। শিক্ষার্থীরা চলচ্চিত্র নির্মাণে কী ধরনের কাজ করা প্রয়োজন, তা বুঝতে শুরু করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা জানান।
চলচ্চিত্র পরিচালক ও শিক্ষক লাবিব নাজমুছ ছাকিব বলেন, চলচ্চিত্র আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বিশেষ দায়বদ্ধতা রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বহুমুখী সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিজেদের প্রতিভা ও স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী কাজে লাগিয়ে তারা চলচ্চিত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসিবুজ্জামান রিক বলেন, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সংগঠনের কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে নিচ্ছে দেখে তিনি আনন্দিত। ভবিষ্যতেও ফিল্ম সোসাইটি নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রচর্চাকে আরও সংগঠিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাবেক ট্রেজারার রাগীব শাহরিয়ার সৈকত বলেন, ‘৩৫ মিলিমিটার’ উৎসবে জবির শিক্ষার্থীদের নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড আরও উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিবাচক সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশও শক্তিশালী হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আয়োজকদের পক্ষে মাঈন উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বল্প সময়ের প্রস্তুতির মধ্যেই ‘৩৫ মিলিমিটার-২০২৬’ আয়োজন করা হয়েছে। ফলে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও দর্শকরা সেগুলো পাশ কাটিয়ে চলচ্চিত্রগুলোর নান্দনিক দিক উপভোগ করেছেন বলে তারা মনে করেন। দর্শকদের প্রতিক্রিয়াই আয়োজকদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি উল্লেখ করে ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী যুবায়ের আহাম্মদ সাফিন বলেন, ‘৩৫ মিলিমিটার’ মূলত জবির শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকে নির্মাতারা নিজেদের কাজের মান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা নিতে পারবেন। চলচ্চিত্রচর্চাকে এগিয়ে নিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি নিয়মিত কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
উৎসবে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকা মেহজাবিন মাইশা বলেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রদর্শিত শর্টফিল্মগুলো তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন। এসব চলচ্চিত্র দেখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা সম্পর্কে তার ধারণা আরও ইতিবাচক হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উৎসবে প্রদর্শিত ‘দ্য সাইলেন্ট উইটনেস’ চলচ্চিত্রের পরিচালক বিশ্বপ্রিয় ভট্টাচার্য কাব্য বলেন, তিনি ক্যাম্পাসের নবীনতম শিক্ষার্থীদের একজন। শত শত দর্শকের সামনে বড় পর্দায় নিজের নির্মাণ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে ভবিষ্যতে আরও বড় দর্শকের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত করবে। এ আয়োজনের জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।
চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী মো. কামরুল হাসান পুরো আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শন শেষে অংশগ্রহণকারী নির্মাতাদের হাতে সম্মানসূচক সনদ তুলে দেওয়া হয়। সবশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেফ্রেম’-এর তৃতীয় সংখ্যার প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘৩৫ মিলিমিটার-২০২৬’ চলচ্চিত্র উৎসব।