ঢাকা ০৬:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন দলের কি লাভ?

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৬:০৬:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৪ ২৩ বার পঠিত

ফারুক খান, সম্পাদক- দৈনিক বাংলাদেশ কণ্ঠ :
বাংলাদেশের রাজনীতি একধরনের নির্বাচনী দোলাচলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় কেউ নির্বাচন চেয়েছে, আবার কেউ চায়নি। শুধু দেশে নয়, বিদেশী অনেক পরাশক্তিশালী দেশগুলোও এদেশের নির্বাচন নিয়ে নানান বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। একটা সময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়াটা দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর অবস্থার দিকে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব বাধা অতিক্রম করে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ কোন দল বা কোন পরাক্রম শক্তিশালী দেশের প্রতি নতজানু নন। এটা আওয়ামী লীগের একটি বড় বিজয়।

২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারী নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত তথ্য হতে জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৭ লাখ ৬৯ হাজার ৭৪১ জন ও নারী ভোটার ৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৮ হাজার ৬৯৯ জন। হিজড়া ভোটার সংখ্যা ৮৪৯ জন। যে সংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসেনি। এর পেছনে সংগত কারণও রয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ নেয়নি। কাজেই তাদের একটা বড় সমর্থক গোষ্ঠী নির্বাচনে ভোট দিতে আসেনি। আর আওয়ামী লীগ ও তার শরীক দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রগণ করে একটা বড় অংশকে ভোটের মাঠে আনতে সক্ষম হয়। এতে করে বলা যায়, নির্বাচনে একটা বড় অংশ ভোটে অংশ নিয়েছে।

উল্লেখ থাকে যে, বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলেও মোট ২৮টি দল ভোটে অংশ নেয়। এসব দলের মোট প্রার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৪ জন। এছাড়াও ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ছিলেন ৪৩৬ জন। আর রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে মোট নারী প্রার্থী ৯০ জন। কাজেই নির্বাচন একবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি তা বলার সুযোগ নেই।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের জোটের শরীকদের মোট ৩৩টি আসন ছাড় দেয়। এতে করে দেখা যায় দলীয়ভাবে আওয়মী লীগ মোট ২৬৬ টি আসনে তাদের প্রার্থী রেখেছিলেন। জাতীয় পার্টিকে দেয়া হয় ২৬ টি আসন। এছাড়াও শরীকদের মধ্যে ওয়াকার্স পার্টি, জাসদ ও জেপি (মঞ্জু) কে মোট ৬টি আসন ছেড়ে দেয়া হয়। আর একটি আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে সে আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়।

অপরদিকে, জোটের শরীক জাতীয় পার্টিকে ২৬টি আসন দেয়া হলেও, তারা ২৬৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেন। অবশ্য বেশ কিছু প্রার্থী বিভিন্ন অজুহাতে নিজেদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্ত যে বিষয়টি স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঘটেনি, সেটি হলো নিজের দলের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করা। বরং বিগত সময়ে দেখা গেছে, যারা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র পার্থী হিসাবে নির্বাচন করতেন তাদের দল থেকে বহিস্কার পর্যন্ত করা হতো। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজের দলের লোকদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। যাতে করে নির্বাচনটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়। আর এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা চরম পরীক্ষার মধ্যে পড়েন। শুধু তাই নয় নৌকার প্রার্থীকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীও বিজয় লাভ করেন। শেখ হাসিনার এমন দুরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনে ভোটর উপস্থিতি বাড়ে ও নির্বাচনও হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূল। এটা আওয়ামী লীগের একটা বড় বিজয় বলা যায়।

অপরদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলেও, তারা তাদের অবস্থান জানান দিতে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। আর এই আন্দোলন এক সময়  জ্বালাও-পোড়াও এর রাজনীতিতে পরিণত হয়। সর্বশেষ রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুন দেয়ার ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি হতাহত হয়েছেন আরো অনেকে। এাড়াও একের পর এক অবরোধ ও হরতালে দেশ অচল হয়ে না পড়লেও, অর্থনীতির ব্যপক ক্ষতি সাধিত হয়। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এর দায় সরকারের উপর চাপাতে চাইলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিজের ঘরে যেমন কেউ আগুন দেয়না, তেমনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ‘দেশের জন্য ক্ষতিকর’ এমন জ্বালাও-পোড়াও এর পথও বেছে নিতে পারে না।

এটা স্বীকার্য যে, বিএনপি দেশের একটি বড় দল। তাদের ভালো একটি সমর্থক গোষ্ঠি রয়েছে। তারা সে সুযোগটা নিতে পারতো। যেহেতু বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের বাইরে থেকে প্রায় ২ শতাধিক ও স্থানীয় প্রায় ২১ হাজার পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন, তাতে করে ভোটে কারচুপি করা এতটা সহজ হতো না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলে তারা একটি সম্মানজনক ফলাফল অর্জন করতে পারতো। কিন্তু তারা দেশের মানুষের চেয়ে বেশী ভরসা করেছেন বিদেশী বিভিন্ন পরাশক্তির কূটনৈতিক তৎপরতার উপর। যার ফল হয়েছে একবারেই শূণ্য। আর একে বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

একটা সময় আসে যখন আমেরিকাসহ বেশ কিছু উন্নত দেশ বাংলাদেশের নির্বাচন পিছিয়ে দেবার জন্য তৎপরতা শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তারা ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। এছাড়াও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন বলে নানারকম গুজব ছড়িয়ে দেন। যা কখনোই কাম্য নয়। যে দেশটি ১৯৭১-এ ৩০ লাখ প্রাণ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই স্বাধীন দেশে বিদেশী প্রভুদের এমন কর্তৃত্ব স্বাধীন চেতা মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এতে করে প্রগতিশীল লোকেরা নির্বাচনে নির্দ্বিধায় ভোট দিতে আসে। যা বিএনপির জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক দিক হিসাবে প্রকাশ পায়।

দ্বাদশ নির্বাচনে একটি বড় দিক হলো, দেশের বাম দলগুলো আবার নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলা চলে। তারা কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে অন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের চাঙ্গা রেখেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যে সুযোগ তারা কখনোই পাননি, তারা এবার সে সুযোগ নিয়ে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। কাজেই এটা বাম রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক ধরনের বিজয় বলা যায়।

দেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে মোট ১১টি দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত। এদের মধ্যে ৭টি দল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় আর ৪টি ইসলামী রাজনৈতিক দল নির্বাচনের বাহিরে থাকে। তারা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট না পেলেও, তারা তাদের অবস্থান যথাযথভাবে জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন। এটিও তাদের একধরনের রাজনৈতিক বিজয় বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করা। যেটা প্রথম দিকে দাতাদের ঋণ সহায়তার মাধ্যমেই হতে যাচ্ছিল। কিন্তু দেশী-বিদেশী কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিয়ে বেশ সমালোচনায় পড়ে যান। অনেকেই বলেছেন, বিষয়টি আসলে ভূতের মুখে রাম নাম নেয়ার মতো। কিন্তু না শেখ হাসিনার সরকার সত্যিই পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থায়নে তৈরি করে প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ আগের মতো তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বাংলাদেশ চাইলে এখন অনেক কিছুই করতে পারে।
আমরা যদি আমাদের পার্শ্ববর্তী  দেশ পাকিস্তানের দিকে তাকাই, তা হলে দেখতে পাব সেখানে প্রায় সময়ই রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগে থাকে। তাদের রাজনৈতিক দৈন্যদশা ও রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতার সুযোগ নিয়ে বিদেশী শক্তি তাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায়। এমনকি তাদের দেশের সরকার পতনেও বিদেশী প্রভুরা অনেক সময় ভূমিকা রাখে বলে কথিত আছে। কিন্তু এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। নিজেদের মাটিতে নিজেরা স্বাধীভাবে দেশ পরিচালনা করবে এটাই প্রতিটি দেশের সংবিধানে লিপিবদ্ধ আছে। বাইরের শক্তিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া মানে নিজেদের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় নিজেদের কর্তৃত্ব ফলাতে গিয়ে এমনটা অনেক সময়ই করে থাকে। যা করতে চেয়েছিল বাংলাদেশেও।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যা করেছে কিছু দেশ, তার মাধ্যমে আসলেই আমরা আমাদের নিজেদের সম্মান কমানো ছাড়া বাড়াইনি। কিন্তু দেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের সম্মান রাখতে বিদেশীদের কূটচালে পা দেননি। পা দেননি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি যে কোন মূল্যে সংবিধানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন। আর সংবিধানের ধারাবকিতা রক্ষার জন্য সকলকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন সম্পন্ন করেন। এটা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিজয় বলা যায়।

কিন্তু সবার মনে প্রশ্ন নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কি হতে চলেছে? বিদেশী পরাশক্তির দেশগুলো কি বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে অর্থনৈতিক খেলায় মেতে ওঠবে? নাকি বাংলাদেশকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে যাবে! আমি মনে করি, বিদেশী শক্তিগুলো বাংলাদেশের সুতোর জোর সম্পর্কে বুঝে গেছে। সুতরাং ভয় পাবার কিছু নেই।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন দলের কি লাভ?

আপডেট সময় : ০৬:০৬:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৪

ফারুক খান, সম্পাদক- দৈনিক বাংলাদেশ কণ্ঠ :
বাংলাদেশের রাজনীতি একধরনের নির্বাচনী দোলাচলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় কেউ নির্বাচন চেয়েছে, আবার কেউ চায়নি। শুধু দেশে নয়, বিদেশী অনেক পরাশক্তিশালী দেশগুলোও এদেশের নির্বাচন নিয়ে নানান বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। একটা সময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়াটা দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর অবস্থার দিকে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব বাধা অতিক্রম করে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ কোন দল বা কোন পরাক্রম শক্তিশালী দেশের প্রতি নতজানু নন। এটা আওয়ামী লীগের একটি বড় বিজয়।

২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারী নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত তথ্য হতে জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৭ লাখ ৬৯ হাজার ৭৪১ জন ও নারী ভোটার ৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৮ হাজার ৬৯৯ জন। হিজড়া ভোটার সংখ্যা ৮৪৯ জন। যে সংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসেনি। এর পেছনে সংগত কারণও রয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ নেয়নি। কাজেই তাদের একটা বড় সমর্থক গোষ্ঠী নির্বাচনে ভোট দিতে আসেনি। আর আওয়ামী লীগ ও তার শরীক দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রগণ করে একটা বড় অংশকে ভোটের মাঠে আনতে সক্ষম হয়। এতে করে বলা যায়, নির্বাচনে একটা বড় অংশ ভোটে অংশ নিয়েছে।

উল্লেখ থাকে যে, বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলেও মোট ২৮টি দল ভোটে অংশ নেয়। এসব দলের মোট প্রার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৪ জন। এছাড়াও ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ছিলেন ৪৩৬ জন। আর রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে মোট নারী প্রার্থী ৯০ জন। কাজেই নির্বাচন একবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি তা বলার সুযোগ নেই।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের জোটের শরীকদের মোট ৩৩টি আসন ছাড় দেয়। এতে করে দেখা যায় দলীয়ভাবে আওয়মী লীগ মোট ২৬৬ টি আসনে তাদের প্রার্থী রেখেছিলেন। জাতীয় পার্টিকে দেয়া হয় ২৬ টি আসন। এছাড়াও শরীকদের মধ্যে ওয়াকার্স পার্টি, জাসদ ও জেপি (মঞ্জু) কে মোট ৬টি আসন ছেড়ে দেয়া হয়। আর একটি আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে সে আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়।

অপরদিকে, জোটের শরীক জাতীয় পার্টিকে ২৬টি আসন দেয়া হলেও, তারা ২৬৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেন। অবশ্য বেশ কিছু প্রার্থী বিভিন্ন অজুহাতে নিজেদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্ত যে বিষয়টি স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঘটেনি, সেটি হলো নিজের দলের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করা। বরং বিগত সময়ে দেখা গেছে, যারা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র পার্থী হিসাবে নির্বাচন করতেন তাদের দল থেকে বহিস্কার পর্যন্ত করা হতো। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজের দলের লোকদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। যাতে করে নির্বাচনটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়। আর এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা চরম পরীক্ষার মধ্যে পড়েন। শুধু তাই নয় নৌকার প্রার্থীকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীও বিজয় লাভ করেন। শেখ হাসিনার এমন দুরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনে ভোটর উপস্থিতি বাড়ে ও নির্বাচনও হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূল। এটা আওয়ামী লীগের একটা বড় বিজয় বলা যায়।

অপরদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলেও, তারা তাদের অবস্থান জানান দিতে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। আর এই আন্দোলন এক সময়  জ্বালাও-পোড়াও এর রাজনীতিতে পরিণত হয়। সর্বশেষ রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুন দেয়ার ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি হতাহত হয়েছেন আরো অনেকে। এাড়াও একের পর এক অবরোধ ও হরতালে দেশ অচল হয়ে না পড়লেও, অর্থনীতির ব্যপক ক্ষতি সাধিত হয়। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এর দায় সরকারের উপর চাপাতে চাইলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিজের ঘরে যেমন কেউ আগুন দেয়না, তেমনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ‘দেশের জন্য ক্ষতিকর’ এমন জ্বালাও-পোড়াও এর পথও বেছে নিতে পারে না।

এটা স্বীকার্য যে, বিএনপি দেশের একটি বড় দল। তাদের ভালো একটি সমর্থক গোষ্ঠি রয়েছে। তারা সে সুযোগটা নিতে পারতো। যেহেতু বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের বাইরে থেকে প্রায় ২ শতাধিক ও স্থানীয় প্রায় ২১ হাজার পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন, তাতে করে ভোটে কারচুপি করা এতটা সহজ হতো না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলে তারা একটি সম্মানজনক ফলাফল অর্জন করতে পারতো। কিন্তু তারা দেশের মানুষের চেয়ে বেশী ভরসা করেছেন বিদেশী বিভিন্ন পরাশক্তির কূটনৈতিক তৎপরতার উপর। যার ফল হয়েছে একবারেই শূণ্য। আর একে বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

একটা সময় আসে যখন আমেরিকাসহ বেশ কিছু উন্নত দেশ বাংলাদেশের নির্বাচন পিছিয়ে দেবার জন্য তৎপরতা শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তারা ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। এছাড়াও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন বলে নানারকম গুজব ছড়িয়ে দেন। যা কখনোই কাম্য নয়। যে দেশটি ১৯৭১-এ ৩০ লাখ প্রাণ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই স্বাধীন দেশে বিদেশী প্রভুদের এমন কর্তৃত্ব স্বাধীন চেতা মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এতে করে প্রগতিশীল লোকেরা নির্বাচনে নির্দ্বিধায় ভোট দিতে আসে। যা বিএনপির জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক দিক হিসাবে প্রকাশ পায়।

দ্বাদশ নির্বাচনে একটি বড় দিক হলো, দেশের বাম দলগুলো আবার নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলা চলে। তারা কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে অন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের চাঙ্গা রেখেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যে সুযোগ তারা কখনোই পাননি, তারা এবার সে সুযোগ নিয়ে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। কাজেই এটা বাম রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক ধরনের বিজয় বলা যায়।

দেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে মোট ১১টি দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত। এদের মধ্যে ৭টি দল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় আর ৪টি ইসলামী রাজনৈতিক দল নির্বাচনের বাহিরে থাকে। তারা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট না পেলেও, তারা তাদের অবস্থান যথাযথভাবে জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন। এটিও তাদের একধরনের রাজনৈতিক বিজয় বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করা। যেটা প্রথম দিকে দাতাদের ঋণ সহায়তার মাধ্যমেই হতে যাচ্ছিল। কিন্তু দেশী-বিদেশী কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিয়ে বেশ সমালোচনায় পড়ে যান। অনেকেই বলেছেন, বিষয়টি আসলে ভূতের মুখে রাম নাম নেয়ার মতো। কিন্তু না শেখ হাসিনার সরকার সত্যিই পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থায়নে তৈরি করে প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ আগের মতো তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বাংলাদেশ চাইলে এখন অনেক কিছুই করতে পারে।
আমরা যদি আমাদের পার্শ্ববর্তী  দেশ পাকিস্তানের দিকে তাকাই, তা হলে দেখতে পাব সেখানে প্রায় সময়ই রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগে থাকে। তাদের রাজনৈতিক দৈন্যদশা ও রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতার সুযোগ নিয়ে বিদেশী শক্তি তাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায়। এমনকি তাদের দেশের সরকার পতনেও বিদেশী প্রভুরা অনেক সময় ভূমিকা রাখে বলে কথিত আছে। কিন্তু এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। নিজেদের মাটিতে নিজেরা স্বাধীভাবে দেশ পরিচালনা করবে এটাই প্রতিটি দেশের সংবিধানে লিপিবদ্ধ আছে। বাইরের শক্তিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া মানে নিজেদের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় নিজেদের কর্তৃত্ব ফলাতে গিয়ে এমনটা অনেক সময়ই করে থাকে। যা করতে চেয়েছিল বাংলাদেশেও।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যা করেছে কিছু দেশ, তার মাধ্যমে আসলেই আমরা আমাদের নিজেদের সম্মান কমানো ছাড়া বাড়াইনি। কিন্তু দেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের সম্মান রাখতে বিদেশীদের কূটচালে পা দেননি। পা দেননি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি যে কোন মূল্যে সংবিধানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন। আর সংবিধানের ধারাবকিতা রক্ষার জন্য সকলকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন সম্পন্ন করেন। এটা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিজয় বলা যায়।

কিন্তু সবার মনে প্রশ্ন নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কি হতে চলেছে? বিদেশী পরাশক্তির দেশগুলো কি বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে অর্থনৈতিক খেলায় মেতে ওঠবে? নাকি বাংলাদেশকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে যাবে! আমি মনে করি, বিদেশী শক্তিগুলো বাংলাদেশের সুতোর জোর সম্পর্কে বুঝে গেছে। সুতরাং ভয় পাবার কিছু নেই।