ঢাকা ০১:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

একমাত্র সুখী মানুষ লালবাবু

বাংলাদেশ কণ্ঠ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৭:০৯:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ মার্চ ২০২৩ ২১ বার পঠিত

চৌধুরী নুপুর নাহার তাজ ,দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি:
সন্ধান মিললো বাংলাদেশের একমাত্র সুখী মানুষের বাড়ীর। দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত খানসামা উপজেলার দুবুলিয়া গ্রামের লালবাবুর সম্পূর্ন জরাজীর্ণ পলিথিনের ছাউনি ঘেরা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে ১৮ বছর ধরে। মাথা গোঁজার ঠিকানা বলতে একমাত্র এই পলিথিনের ঘেরা ঘরটি। তাও আবার অন্যের জমিতে। জরাজীর্ণ, ভাঙ্গাচুরা, লক্কর-ঝক্কর পলিথিনের ঘরে পাতার বিছানায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন এই লাল বাবুর।
রোদে শুকিয়ে আর বৃষ্টিতে ভিজেও মহা আনন্দ নিয়ে বসবাস করেন সেই পলিথিনের ঘরে। ঘরের এমনই অবস্থা ভেতরে ঢুকতে হলে হামাগুড়ি না খেয়ে ঢোকার কোনো উপায় নেই। বৃষ্টি হলে পানিতে সয়লাভ হয়ে যায় ঘরের ভেতর বাহির। ঘরের মধ্যে দিনের বেলাও পৌঁছে না সূর্যের আলো। পায়নি কোনো সরকারি সেবা। তবুও মনের সুখে মহা আনন্দে সেখানেই বাস করছেন লাল বাবু। ঝড়-বৃষ্টি- শীতে মেঝেতে মাটির উপরে তার পরিপাটি বিছানা। রোগা শরীর নিয়ে কোনো মতে কাজ করেন। কাজ না করতে পারলে পান্তা ভাত আর পোঁড়া মরিচও তার কপালে জুটেনা। কখনও কখনও না খেয়েও দিন পার করতে হচ্ছে লাল বাবুর। মানবেতর জীবনযাপনের এই গল্প ৪৫ বছর বয়সী লাল বাবুর। নামে বাবু হলেও কাজের নাই কিছুই। এই লাল বাবু দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ৬ নং গোয়ালডিহি ইউনিয়নের দুবুলিয়া গ্রামের চিয়াতী পাড়ায় বসবাস করেন। পিতা বিজয় বর্মন। কৃষি কাজ করে দিন কাটতো তাদের। ছোট বেলায় বাবা মায়ের অনেক আদরের সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল বাবু। খুব বেশি জমিজমা না থাকলেও খুব সুখের ছিলো তাদের সংসার। লাল বাবুর যখন ১৬ বছর বয়স তখন হঠাৎই তার মা সাপের দংশনে মারা যান। মা মারা যাওয়ায় পিতা আবার এক বিধবা নারীকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসেন । সে ঘরে এক এক করে জন্ম নেয় তিনটি সন্তান। সৎ মায়ের সংসারে অযত্নে অবহেলায় দিন দিন কাটতো লাল বাবুর। এক সময় লাল বাবু আশ্রয় নেয় তার মাকে যেখানে কবর দিয়েছিলো ঠিক তার পাশেই। খেয়ে না খেয়ে দিন রাত কাটায় সেখানে। এরপর সে পলিথিন যোগাড় করে মায়ের কবরের পাশেই খোপড়ার মতো তৈরী করে বসবাস শুরু করেন আজ থেকে ১৮ বছর পূর্বে । তার বাবার যতটুকু জমি জমা ছিলো পুরাটাই তার সৎ ভাইবোনদের নামে লিখে দেন। লাল বাবু জমির সিকি পরিমান অংশও পাননি। এ নিয়েও নেই কোনো অভিযোগ তার।  সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার ৬ নং গোয়ালডিহি ইউনিয়নের দুবলিয়া গ্রামের চিয়াতী পাড়ায় লাল বাবুর ১০ হাত আর ৫ হাতের ছোট্ট একটি ঝাপড়ার ঘরে এলোমেলো পুরনো পরিষ্কার কাপড়-চোপড়। মাটির উপর পরিপাটি পাতার বিছানা, ঘরের পশ্চিম এককোণে চুলা, আর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাঁড়ি-পাতিল। গাছে ঝোলানো শিকেতে পাতিল। এ সব নিয়েই তার সংসার। দুই পাশে ফসলি ক্ষেত, নির্জন শ্বসানের পাশেই পলিথিন দিয়ে মোড়ানো লালবাবুর আবাসস্থল। পল্লী কবি জসিম উদ্দীনের আসমানি কবিতাকেও হার মানাবে।
কষ্টের জীবনের কথা জানতে চাইলে লালবাবু বলেন, ‘অনেক ভাল আছি আমি সুখি আর এটা সুখি মানুষের বাড়ী। জন্মদাতা পিতা বিধবা নারীকে বিয়ে করে সুখের সংসার পেতেছিলো। জমি জমা সব ভাইবোনদের দিয়ে দিয়েছে। আমি আছি আমার মায়ের কবরের পাশে। খুব ভালো আছি।’
খাওয়া দাওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি এলোমেলো ভাবে উত্তর দেন, নিজেই রান্না করি। মানুষ কাজে ডাকলে যাই, কাজ করে দেই। তাই দিয়ে চাউল আনি তরকারি আনি। আমার এই ঘর থেকে হাড়ি পাতিল প্লেট চুরি হয়ে যায়। তাদের কিছুই করতে পারিনা। সরকার ভূমিহীনদের ঘর দিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এখান থেকে অন্য কোথাও যাবোনা। আমার মায়ের কবরের পাশেই আমি থাকবো। সুখি মানুষের বাড়ীর খবর দৈনিক বাংলাদেশ কন্ঠ পত্রিকার দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী নুপুর নাহার তাজ এর এক ফেসবুক স্টেটাস দেখে ঘটনা স্থলের খবর নেন খানসামা উপজেলা চেয়ারম্যান সফিউল আযম চৌধুরী লায়ন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাশিদা আক্তার। তিনি লালবাবুকে তরিৎ গতিতে সরকারী খরচে একটি বাড়ী নির্মান করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
বিষয়টি মনিটরিং করেন উপজেলা ভূমি কমিশনার মারুফ হাসান। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সামনে স্থানীয় একজন সম্মানীত ব্যাক্তি আলহাজ্ব মতিয়ার রহমান লালবাবুকে বাড়ী করার জন্যে জমি এককালিন দিতে চান। ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার রশন আলী রোকন সহ এলাকার ভালো মনের মানুষের লালবাবুকে সব রকমের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

একমাত্র সুখী মানুষ লালবাবু

আপডেট সময় : ০৭:০৯:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ মার্চ ২০২৩

চৌধুরী নুপুর নাহার তাজ ,দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি:
সন্ধান মিললো বাংলাদেশের একমাত্র সুখী মানুষের বাড়ীর। দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত খানসামা উপজেলার দুবুলিয়া গ্রামের লালবাবুর সম্পূর্ন জরাজীর্ণ পলিথিনের ছাউনি ঘেরা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে ১৮ বছর ধরে। মাথা গোঁজার ঠিকানা বলতে একমাত্র এই পলিথিনের ঘেরা ঘরটি। তাও আবার অন্যের জমিতে। জরাজীর্ণ, ভাঙ্গাচুরা, লক্কর-ঝক্কর পলিথিনের ঘরে পাতার বিছানায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন এই লাল বাবুর।
রোদে শুকিয়ে আর বৃষ্টিতে ভিজেও মহা আনন্দ নিয়ে বসবাস করেন সেই পলিথিনের ঘরে। ঘরের এমনই অবস্থা ভেতরে ঢুকতে হলে হামাগুড়ি না খেয়ে ঢোকার কোনো উপায় নেই। বৃষ্টি হলে পানিতে সয়লাভ হয়ে যায় ঘরের ভেতর বাহির। ঘরের মধ্যে দিনের বেলাও পৌঁছে না সূর্যের আলো। পায়নি কোনো সরকারি সেবা। তবুও মনের সুখে মহা আনন্দে সেখানেই বাস করছেন লাল বাবু। ঝড়-বৃষ্টি- শীতে মেঝেতে মাটির উপরে তার পরিপাটি বিছানা। রোগা শরীর নিয়ে কোনো মতে কাজ করেন। কাজ না করতে পারলে পান্তা ভাত আর পোঁড়া মরিচও তার কপালে জুটেনা। কখনও কখনও না খেয়েও দিন পার করতে হচ্ছে লাল বাবুর। মানবেতর জীবনযাপনের এই গল্প ৪৫ বছর বয়সী লাল বাবুর। নামে বাবু হলেও কাজের নাই কিছুই। এই লাল বাবু দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ৬ নং গোয়ালডিহি ইউনিয়নের দুবুলিয়া গ্রামের চিয়াতী পাড়ায় বসবাস করেন। পিতা বিজয় বর্মন। কৃষি কাজ করে দিন কাটতো তাদের। ছোট বেলায় বাবা মায়ের অনেক আদরের সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল বাবু। খুব বেশি জমিজমা না থাকলেও খুব সুখের ছিলো তাদের সংসার। লাল বাবুর যখন ১৬ বছর বয়স তখন হঠাৎই তার মা সাপের দংশনে মারা যান। মা মারা যাওয়ায় পিতা আবার এক বিধবা নারীকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসেন । সে ঘরে এক এক করে জন্ম নেয় তিনটি সন্তান। সৎ মায়ের সংসারে অযত্নে অবহেলায় দিন দিন কাটতো লাল বাবুর। এক সময় লাল বাবু আশ্রয় নেয় তার মাকে যেখানে কবর দিয়েছিলো ঠিক তার পাশেই। খেয়ে না খেয়ে দিন রাত কাটায় সেখানে। এরপর সে পলিথিন যোগাড় করে মায়ের কবরের পাশেই খোপড়ার মতো তৈরী করে বসবাস শুরু করেন আজ থেকে ১৮ বছর পূর্বে । তার বাবার যতটুকু জমি জমা ছিলো পুরাটাই তার সৎ ভাইবোনদের নামে লিখে দেন। লাল বাবু জমির সিকি পরিমান অংশও পাননি। এ নিয়েও নেই কোনো অভিযোগ তার।  সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার ৬ নং গোয়ালডিহি ইউনিয়নের দুবলিয়া গ্রামের চিয়াতী পাড়ায় লাল বাবুর ১০ হাত আর ৫ হাতের ছোট্ট একটি ঝাপড়ার ঘরে এলোমেলো পুরনো পরিষ্কার কাপড়-চোপড়। মাটির উপর পরিপাটি পাতার বিছানা, ঘরের পশ্চিম এককোণে চুলা, আর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাঁড়ি-পাতিল। গাছে ঝোলানো শিকেতে পাতিল। এ সব নিয়েই তার সংসার। দুই পাশে ফসলি ক্ষেত, নির্জন শ্বসানের পাশেই পলিথিন দিয়ে মোড়ানো লালবাবুর আবাসস্থল। পল্লী কবি জসিম উদ্দীনের আসমানি কবিতাকেও হার মানাবে।
কষ্টের জীবনের কথা জানতে চাইলে লালবাবু বলেন, ‘অনেক ভাল আছি আমি সুখি আর এটা সুখি মানুষের বাড়ী। জন্মদাতা পিতা বিধবা নারীকে বিয়ে করে সুখের সংসার পেতেছিলো। জমি জমা সব ভাইবোনদের দিয়ে দিয়েছে। আমি আছি আমার মায়ের কবরের পাশে। খুব ভালো আছি।’
খাওয়া দাওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি এলোমেলো ভাবে উত্তর দেন, নিজেই রান্না করি। মানুষ কাজে ডাকলে যাই, কাজ করে দেই। তাই দিয়ে চাউল আনি তরকারি আনি। আমার এই ঘর থেকে হাড়ি পাতিল প্লেট চুরি হয়ে যায়। তাদের কিছুই করতে পারিনা। সরকার ভূমিহীনদের ঘর দিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এখান থেকে অন্য কোথাও যাবোনা। আমার মায়ের কবরের পাশেই আমি থাকবো। সুখি মানুষের বাড়ীর খবর দৈনিক বাংলাদেশ কন্ঠ পত্রিকার দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি চৌধুরী নুপুর নাহার তাজ এর এক ফেসবুক স্টেটাস দেখে ঘটনা স্থলের খবর নেন খানসামা উপজেলা চেয়ারম্যান সফিউল আযম চৌধুরী লায়ন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাশিদা আক্তার। তিনি লালবাবুকে তরিৎ গতিতে সরকারী খরচে একটি বাড়ী নির্মান করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
বিষয়টি মনিটরিং করেন উপজেলা ভূমি কমিশনার মারুফ হাসান। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সামনে স্থানীয় একজন সম্মানীত ব্যাক্তি আলহাজ্ব মতিয়ার রহমান লালবাবুকে বাড়ী করার জন্যে জমি এককালিন দিতে চান। ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার রশন আলী রোকন সহ এলাকার ভালো মনের মানুষের লালবাবুকে সব রকমের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।